প্রাচীন যুগ (চর্যাপদ)
Ancient Period (Charyapada)
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র প্রামাণ্য নিদর্শন 'চর্যাপদ' হলো মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণায় সান্ধ্যভাষার এই গীতসংকলন প্রাচীন বাংলা ভাষার আদি রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যাতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্বের রূপকে তৎকালীন বাঙালি সমাজজীবনের নিখুঁত বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত 'নবচর্যাপদ' ও 'নতুন চর্যাপদ' বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারাবাহিক বিকাশকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।
চর্যাপদের সাধারণ পরিচয় ও আবিষ্কারের ইতিহাস
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন বা আদি যুগের একমাত্র সাহিত্যিক ও প্রামাণ্য নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু আপাতদৃষ্টিতে দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধক। প্রাচীন যুগের সাহিত্যের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। এ যুগে ধর্মের বিষয়টি মানুষের সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে, ফলে সাহিত্যেও ধর্মভাবনা প্রধান হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন যুগের সময়সীমা ও চর্যাপদের রচনাকাল:
ের রচনাকাল তথা প্রাচীন যুগের সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
| গবেষক / ভাষাতাত্ত্বিক | প্রাচীন যুগের সময়কাল | চর্যাপদের রচনাকাল |
|---|---|---|
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ | ৬৫০ – ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ (৭ম – ১২শ শতক) | ৬৫০ – ১২০০ সাল |
| ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় | ৯৫০ – ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ (১০ম – ১২শ শতক) | ৯৫০ – ১২০০ সাল |
| ড. সুকুমার সেন | ৯০০ – ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ (১০ম – ১৪শ শতক) | ৯৫০ – ১৩৫০ সাল |
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: রচনার সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। পাল রাজবংশ প্রায় চারশত বছর (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক) বাংলা শাসন করেছিল। পাল রাজাদের উদার ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ের সাধনসংগীতগুলো রচিত হয়।
চর্যাপদের বিভিন্ন নাম ও নামের তাৎপর্য:
পুথির মূল নাম নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এটি 'চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়', 'চর্যাগীতিকোষ', 'চর্যাগীতি' বা সংক্ষেপে 'চর্যাপদ' নামে পরিচিত।
- চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় শব্দের অর্থ: ‘চর্য’ (যা আচরণীয় বা পালনীয়) + ‘অ-চর্য’ (যা অনাচরণীয় বা বর্জনীয়) + ‘বিনিশ্চয়’ (নির্ণয় বা নির্ধারণ)। অর্থাৎ যে সাধনসংগীত সংকলনের সাহায্যে কোনটি আচরণীয় আর কোনটি অনাচরণীয় তা নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায়, তাকে বলে।
- মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত সাধনসংগীত বা গানের সংকলন, যাতে বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় তত্ত্বকথা বিধৃত হয়েছে।
চর্যাপদের পুথি নেপালে পাওয়ার কারণ:
বাংলায় রচিত হওয়া সত্ত্বেও নেপালের রাজদরবারে প্রাপ্তির পেছনে দুটি ঐতিহাসিক কারণ বিদ্যমান:
- সেন আমলের ধর্মীয় নিপীড়ন: পাল বংশের পতনের পর বাংলায় সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন সময়কালে ধর্মীয় সংকীর্ণতায় নিমজ্জিত কতিপয় হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসক বৌদ্ধ সহজিয়াদের ওপর সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন চালায়।
- তুর্কি আক্রমণ (১২০৪ খ্রি.): ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর মুসলিম তুর্কি অভিযানের ভয়ে বৌদ্ধ পণ্ডিত ও সিদ্ধাচার্যগণ তাঁদের অমূল্য ধর্মীয় পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চল নেপাল, ভুটান ও তিব্বতে পালিয়ে যান। এ কারণেই ের পুথি নেপালে সংরক্ষিত ছিল।
চর্যাপদ আবিষ্কার ও প্রকাশের ঐতিহাসিক পরিক্রমা:
- ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দ: 'বিবিধার্থ বঙ্গদর্শন'-খ্যাত পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপালে অনুসন্ধান চালিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাহিত্যের তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ 'Sanskrit Buddhist Literature in Nepal' প্রকাশ করেন।
- পুথি সংগ্রহের দায়িত্ব: রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুর পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলা, বিহার, আসাম ও নেপাল অঞ্চলের প্রাচীন পুথি সংগ্রহের দায়িত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন বিভাগীয় প্রধান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে (১৮৫৩–১৯৩১)।
- আবিষ্কার (১৯০৭ খ্রি.): পর পর তিনবার নেপাল ভ্রমণ করেন (প্রথমবার ১৮৯৭, দ্বিতীয়বার ১৮৯৮ এবং তৃতীয়বার ১৯০৭ সালে)। তৃতীয় প্রচেষ্টায় ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি (Royal Library বা রাজগ্রন্থশালা) থেকে তিনি তালপাতার একটি প্রাচীন পুথি আবিষ্কার করেন।
- একত্রে প্রাপ্ত ৪টি গ্রন্থ: নেপাল থেকে একত্রে ৪টি পুথি উদ্ধার করেন:
- চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় (একমাত্র এটিই প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত)
- ডাকার্ণব (অপভ্রংশ ভাষায় রচিত)
- সরহপাদের দোহা (অপভ্রংশ ভাষায় রচিত)
- কৃষ্ণপাদের দোহা (অপভ্রংশ ভাষায় রচিত)
- ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ: এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে নেপালে প্রাপ্ত তালপাতার পুথির বর্ণনামূলক তালিকাগ্রন্থ 'A Catalogue of Palm Leaf and selected Paper MSS. Belonging to the Durbar Library, Nepal' প্রকাশ করেন।
- গ্রন্থাকারে প্রকাশ (১৯১৬ খ্রি. / ১৩২৩ বঙ্গাব্দ): মহামহোপাধ্যায় র একক সম্পাদনায় কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে চারটি পুথি একত্রে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়।
পদসংখ্যা, পদকর্তাগণ ও খণ্ডিত পদের পাঠোদ্ধার
চর্যাপদের মূল পুথিতে পদসংখ্যা এবং পদকর্তাদের সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দুটি প্রধান মত প্রচলিত রয়েছে:
পদসংখ্যা ও কবিদের সংখ্যা সম্পর্কিত মতভেদ:
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ('Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থ):
- মোট পদসংখ্যা: ৫০টি
- মোট পদকর্তা / কবি: ২৩ জন
- আবিষ্কৃত/প্রাপ্ত পদের সংখ্যা: সাড়ে ছেচল্লিশটি (৪৬.৫টি)
- ড. সুকুমার সেনের মতে ('বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থ):
- মোট পদসংখ্যা: ৫১টি
- মোট পদকর্তা / কবি: ২৪ জন
পদকর্তাদের উপাধি: চর্যাপদের কবিদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' (সংস্কৃত 'পাদ' শব্দের অপভ্রংশ) যুক্ত হয়েছে। চর্যায় পদ রচনাকারী এই বৌদ্ধ সাধকদের প্রত্যেককে 'মহাসিদ্ধ' বা 'সিদ্ধাচার্য' বলা হয়।
পদকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা (২৪ জন):
চর্যাপদে উল্লিখিত পদকর্তাগণ হলেন:
- আর্যদেবপা
- কক্ষণপা
- কমলাম্বরপা
- কুক্কুরীপা
- গুণ্ডরীপা
- চাটিলপা
- জয়নন্দীপা
- ঢেগুণপা
- ডোমীপা
- তাত্তীপা
- তাড়কপা
- দারিকপা
- ধর্ম্মপা
- বিরূপা
- বীণাপা
- ভাদেপা
- ভুসুকুপা (প্রকৃত নাম: শান্তিদেব)
- মহীগুণা (মহীধরপা)
- লাড়িডোমীপা
- শবরপা
- শান্তিপা
- সরহপা
অনুপস্থিত ও খণ্ডিত সাড়ে চারটি পদের বিবরণ:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক প্রাপ্ত মূল তালপাতার পুথির পাতা ছেঁড়া থাকায় মোট সাড়ে ৪টি পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি:
- ২৩ নং পদ (অর্ধেক পাওয়া গেছে): রচয়িতা ভুসুকুপা
- ২৪ নং পদ (সম্পূর্ণ নিখোঁজ): রচয়িতা কাহ্নপা
- ২৫ নং পদ (সম্পূর্ণ নিখোঁজ): রচয়িতা তাত্তীপা
- ৪৮ নং পদ (সম্পূর্ণ নিখোঁজ): রচয়িতা কুক্কুরীপা
প্রধান পদকর্তা ও পদের বিন্যাস:
| পদকর্তার নাম | পদের সংখ্যা | রচিত পদের নম্বর ও বিশেষ পরিচিতি |
|---|---|---|
| কাহ্নপা (কৃষ্ণাচার্য) | ১৩টি (সর্বোচ্চ) | ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ২৪ (অনুপলব্ধ), ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৫ |
| ভুসুকুপা (শান্তিদেব) | ৮টি (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) | ৬, ২১, ২৩ (অর্ধেক প্রাপ্ত), ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ (বাঙালি কবি) |
| সরহপা | ৪টি | ২২, ৩২, ৩৮, ৩৯ |
| কুক্কুরীপা | ৩টি | ২, ২০, ৪৮ (অনুপলব্ধ) [চর্যাপদের একমাত্র মহিলা কবি] |
| লুইপা | ২টি | ১, ২৯ [চর্যাপদের আদি কবি; রাঢ়ীয় বাঙালি সাধক] |
| শবরপা | ২টি | ২৮, ৫০ [প্রাচীনতম চর্যাকার (৬৮০–৭৬০ খ্রি.); বাঙালি কবি] |
| শান্তিপা | ২টি | ১৫, ২৬ |
| অবশিষ্ট ১৬ জন পদকর্তা | ১টি করে | আর্যদেবপা, কক্ষণপা, কমলাম্বরপা, গুণ্ডরীপা, চাটিলপা, জয়নন্দীপা, ঢেগুণপা, ডোমীপা, তাত্তীপা, তাড়কপা, দারিকপা, ধর্ম্মপা, বিরূপা, বীণাপা, ভাদেপা, মহীগুণা |
| লাড়িডোমীপা | ০টি | তাঁর নাম চর্যায় পাওয়া গেলেও কোনো পদ পাওয়া যায়নি |
আদি কবি ও চর্যাপদের প্রথম পদ:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অধিকাংশ গবেষকের মতে চর্যাপদের আদি কবি হলেন লুইপা (তিনি শবরপার শিষ্য এবং রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি ছিলেন)। চর্যাপদের ১ নম্বর পদটি কর্তৃক রচিত:
চর্যাপদের প্রথম পদ (১ নং পদ - লুইপা): "কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥ দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ। লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥ সঅল সহিঅ কাহি করিঅই। সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই ॥ এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস। সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥ ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা। ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥"
প্রাচীনতম, আধুনিকতম ও বাঙালি চর্যাকার:
- প্রাচীনতম চর্যাকার: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার হলেন শবরপা (সময়কাল: আনুমানিক ৬৮০ – ৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ)।
- আধুনিকতম চর্যাকার: ড. শহীদুল্লাহর মতে আধুনিকতম চর্যাকার হলেন ভুসুকুপা (সময়কাল: আনুমানিক একাদশ শতক)।
- বাঙালি চর্যাকারগণ: চর্যার পদকর্তাদের মধ্যে লুইপা, শবরপা এবং ভুসুকুপা বাঙালি কবি হিসেবে সুপরিচিত।
টীকা ও অনুবাদ সাহিত্য:
- সংস্কৃত টীকাকার (মুনিদত্ত): প্রাচীন টীকাকার চর্যাপদের পদগুলোর সংস্কৃত ভাষায় গূঢ়ার্থ ব্যাখ্যা করেন। তবে তিনি ১১ নং পদের কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।
- তিব্বতি অনুবাদ ও আবিষ্কার: পণ্ডিত কীর্তিচন্দ্র প্রাচীনকালে চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী নেপাল ও তিব্বত থেকে এই তিব্বতি অনুবাদ আবিষ্কার ও প্রকাশ করেন। এতে হারিয়ে যাওয়া খণ্ডিত সাড়ে চারটি পদেরও (২৩-এর অর্ধেক, ২৪, ২৫, ৪৮) তিব্বতি পাঠ উদ্ধার হয়। এগুলো সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তর করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'Journal of the Department of Letters' (1938)-এ প্রকাশ করেন।
- খণ্ডিত পদের প্রাচীন বাংলায় রূপান্তর: ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুকুমার সেন র সংস্কৃত রূপান্তর ও ের তিব্বতি অনুবাদের ভিত্তিতে খণ্ডিত পদগুলোকে প্রাচীন বাংলায় রূপান্তর করে Indian Linguistics (১০ম খণ্ড: 'Old Bengali Texts or Charyagitikosa')-এ প্রকাশ করেন।
চর্যাপদের বিভিন্ন ভাষার অনুবাদক ছক:
| অনূদিত ভাষা | অনুবাদকের নাম | অনুদিত গ্রন্থের নাম ও সাল |
|---|---|---|
| তিব্বতি | — | |
| সংস্কৃত | Journal of the Department of Letters (১৯৩৮) | |
| হিন্দি | রাহুল সাংকৃত্যায়ন | দোহাকোষ (১৯৫৭) |
| ইংরেজি | হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ | Mystic Poetry of Bangladesh (২০১৭) |
চর্যাপদের ভাষা, ছন্দ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক
চর্যাপদের ভাষা ও ছন্দ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায়।
চর্যাপদের ভাষা ও সান্ধ্যভাষার স্বরূপ:
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত (সন্ধ্যা ভাষা / সান্ধ্য ভাষা): চর্যাপদের আবিষ্কারক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে এর ভাষা হলো 'সন্ধ্যা ভাষা' বা 'সান্ধ্য ভাষা' বা 'আলো-আঁধারির ভাষা'। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর ব্যাখ্যায় বলেছেন— "আলো-আঁধারির ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না"। অর্থাৎ যে ভাষার বাহ্যিক এক অর্থ কিন্তু সাধনতত্ত্বের নিরিখে অন্তর্নিহিত গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থ ভিন্ন, তাই সন্ধ্যা ভাষা।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত (বঙ্গকামরূপী): ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ভাষাকে প্রাচীন বাংলার রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে এর নাম দেন 'বঙ্গকামরূপী'।
- ছন্দ: চর্যাপদ মূলত মাত্রাবৃত্ত (পাদাকুলক) ছন্দে রচিত। বাংলা কবিতার চরণের শেষে যে অন্ত্যমিল (Rhyme) দেখা যায়, তার আদিম উৎসমূল চর্যাপদেই বিদ্যমান।
চর্যাপদের ভাষা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও বাংলা ভাষার আদি রূপ প্রতিষ্ঠা:
১৯১৬ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় গ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই এর ভাষা নিয়ে ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়:
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও বসন্তরঞ্জন রায়ের দাবি: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদকে খাঁটি প্রাচীন বাংলার আদি নিদর্শন বলে দাবি করেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কারক পণ্ডিত বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এ মতকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান।
- ভাষাতাত্ত্বিক অস্বীকার ও আঞ্চলিক দাবি: ১৯২০ সালে বিজয়চন্দ্র মজুমদার তাঁর 'History of the Bengali Language' গ্রন্থে চর্যাগীতিকে বাংলা ভাষার নিদর্শন হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। একই সাথে হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া ও মৈথিলি ভাষার গবেষকগণ চর্যাপদকে তাঁদের স্ব স্ব ভাষার আদি নিদর্শন বলে দাবি করেন।
- ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (১৯২৬ খ্রি.): ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ 'The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL)-এ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় চর্যার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ, রূপমূল, ছন্দ এবং পদকর্তাদের নাম ও আঞ্চলিক নদী-স্থানের নাম বিশ্লেষণ করে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন যে, চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা।
- ভৌগোলিক প্রমাণ: চর্যাপদের ৪৯ নং পদে ভুসুকুপা পদ্মা নদীকে 'পউয়া খাল' হিসেবে উল্লেখ করেছেন ("বাজ ণাব পাড়ী পউঅা খালেঁ বাহিউ"), যা এর ভৌগোলিক পটভূমি যে অবিভক্ত বাংলা অঞ্চল তা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সমর্থন (১৯২৭ খ্রি.): ১৯২৭ সালে প্যারিস থেকে প্রকাশিত তাঁর গবেষণা গ্রন্থ 'Les Chants Mystiques de Saraha et de Kanha' এবং পরবর্তীতে 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে ড. শহীদুল্লাহ সুনীতিকুমারের মতকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে চর্যাপদকে প্রাচীন বাংলার প্রাচীনতম রূপ বলে প্রতিষ্ঠা করেন।
সমকালীন সমাজচিত্র, প্রবাদ-প্রবচন ও বিশিষ্ট কবিগণ
চর্যাপদের মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব ও গুপ্ত সাধনপদ্ধতি চর্চা হলেও তৎকালীন অন্ত্যজ ও সাধারণ বাঙালি সমাজের নিখুঁত বাস্তব সমাজচিত্র পদগুলোতে অপরূপ দক্ষতায় চিত্রিত হয়েছে।
প্রতিফলিত সমাজজীবন ও মানুষের পেশা:
চর্যাপদে তৎকালীন সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষের পরিচয় ও পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়:
- সমাজশ্রেণি: কাপালিক, যোগী, , চণ্ডালী, শবরী, ব্যাধ, তাঁতি, ধুনরী, শুঁড়ি, মাহুত, নট-নটী, পতিতা প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনযাপন বর্ণিত হয়েছে।
- পেশা ও জীবিকা:
- ডোমী শ্রেণি: তাঁত বোনা ও বাঁশের চাঙারি তৈরি ("অস্তি বিকণঅ ডোমী অবর না চাঙ্গেড়া"), ভাত/মদ চোয়ানো ("চীঅণ বাকলত বারুণী বাঙ্গই"), নৃত্য ও নটবৃত্তি ("তহিঁ চড়ি নাচই ডোমি বাপুড়ি") এবং খেয়া নৌকা চালানো।
- ব্যাধ শ্রেণি: বনে বনে হরিণ শিকার করা ("জই তুম হে ভুসুকু অহেরি জাইবেঁ মারিহসি পাঞ্চজণা")।
- নৌকা চালনা ও নদীজীবন: নৌকা বাওয়া ("বাজ ণাব পাড়ী পউঅা খালেঁ বাহিউ"), নদীর পাড়ে গুণ টানা ("ঘুল্টি উপাড়ী মেলিলি কাছি"), জল সেচা ইত্যাদি।
- ধুনুরি: তুলা ধুনা বা আঁশ ছাড়ানো ("তুলা ধুণি ধুণি অঁসুরে অঁসু")।
- চুরি-ডাকাতি ও পাহারা: রাত্রিকালীন চুরি ও প্রহরীর নজরদারি ("জো সো চোর সোহি সাধী")।
- দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের মর্মস্পর্শী চিত্র: ঢেগুণপার ৩৩ নং পদে ফুটে উঠেছে তৎকালীন চরম অভাব ও দারিদ্র্যের বাস্তব রূপ:
"টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী। হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেসী ॥" (অর্থ: টিলার ওপর আমার একলা ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই; হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রেমিক/অতিথিরা এসে ভিড় জমায়।)
চর্যাপদের ৬টি বিখ্যাত প্রবাদ-প্রবচন:
চর্যাপদে সমকালীন লোকজীবনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রসূত ৬টি অবিস্মরণীয় প্রবাদ বাক্য রয়েছে:
| প্রবাদ বাক্য (মূল চর্যাংশ) | আধুনিক বাংলা অর্থ | পদ নম্বর | রচয়িতা কবি |
|---|---|---|---|
| অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী | হরিণের মাংসই তার নিজের জীবনের প্রধান শত্রু | ৬ নং পদ | ভুসুকুপা |
| হাথে রে কাক্কাণ মা লোউ দাপণ | হাতের কাঁকন (বালা) দেখার জন্য দর্পণ বা আয়নার প্রয়োজন হয় না | ৩২ নং পদ | সরহপা |
| হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেসী | হাঁড়িতে অন্ন নেই, অথচ নিত্য প্রেমিক/অতিথি এসে ভিড় করে | ৩৩ নং পদ | ঢেগুণপা |
| দুহিল দুখু কি বেন্টে সমায় (যামায়) | দোহন করা দুধ কি আর গাইয়ের বাঁটে ফিরিয়ে দেওয়া যায়? | ৩৩ নং পদ | ঢেগুণপা |
| বর সুণ গোহালী কিমো দুটঠ বলদেঁ | দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো | ৩৯ নং পদ | সরহপা |
| অণ চাহন্তে আণ বিণঠা | এক জিনিস চাইতে গিয়ে অন্য জিনিস বিনষ্ট হলো | ৪৪ নং পদ | কক্ষণপা |
অন্যান্য প্রচলিত রূপকল্প: ২ নং পদে কুক্কুরীপা লিখেছেন— "রুখের তেন্তুলি কুমীরে খাই" (গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়), যা বৈপরীত্যমূলক সাধনরহস্য প্রকাশের একটি রূপক।
বিশিষ্ট পদকর্তাদের বিশদ পরিচয়:
১. কাহ্নপা (কানুপা / কৃষ্ণপাদ / কৃষ্ণাচার্য):
- চর্যাপদের সর্বাধিক ১৩টি পদের রচয়িতা।
- তিনি উড়িষ্যার ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও মহারাজ দেবপালের শাসনকালে বর্তমান নওগাঁর পাহাড়পুরস্থ সোমপুর মহাবিহারে বসবাস ও সাধনকার্য করতেন।
- কাহ্নপা ছিলেন সহজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধযোগী এবং তিনি একাধারে ধর্মশাস্ত্র ও সংগীতশাস্ত্র উভয় বিদ্যায় অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন।
২. ভুসুকুপা (প্রকৃত নাম: শান্তিদেব):
- চর্যাপদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮টি পদের রচয়িতা।
- তিনি নিজেকে সরাসরি 'বাঙালি' হিসেবে পরিচয় দিয়ে গৌরববোধ করেছেন। ৪৯ নং পদে তাঁর অমর উক্তি:
"আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী। নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলী ॥" (অর্থ: আজ ভুসুকু খাঁটি বাঙালি হলো, কারণ সে চণ্ডাল নারীকে নিজ গৃহিণী রূপে গ্রহণ করেছে।)
চর্যাপদের ধর্মমত ও বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব
চর্যাপদ শুধু প্রাচীন ভাষার নমুনা নয়, এটি সমকালীন দার্শনিক চিন্তা ও বাঙালি জাতির হাজার বছরের সাহিত্যের সূচনাবিন্দু।
চর্যাপদের ধর্মতত্ত্ব ও দার্শনিক ভিত্তি:
চর্যাপদের ধর্মমত নিয়ে প্রথম বিজ্ঞানসম্মত বিস্তারিত আলোচনা করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে।
গৌতম বুদ্ধের প্রয়াণ
│
├────────────────────────┐
▼ ▼
হীনযান (প্রাচীনপন্থী) মহাযান (আধুনিক উদারপন্থী)
│
┌───────────────┴───────────────┐
▼ ▼
বজ্রযান সহজযান
│
▼
চর্যাপদ
(সহজযান সম্প্রদায়ের সাধনসংগীত)
- সহজযান ও কায়াসাধনা: চর্যাপদ মহাযান বৌদ্ধধর্মের অন্তর্গত সহজযান শাখার সাধনপ্রণালী ও ধর্মতত্ত্ব। তাঁদের মূল অবলম্বন ছিল মানবদেহের তত্ত্বোপলব্ধি (কায়াসাধনা) এবং গুরুপ্রণালী। কাহ্নপা ১৩ নং পদে মানবদেহের সাধনরহস্য তুলে ধরেছেন।
- মহাসুখরূপ নির্বাণ লাভ: সহজিয়া বৌদ্ধদের পরম লক্ষ্য হলো 'মহাসুখরূপ নির্বাণ লাভ'। এ প্রসঙ্গে চর্যাকার ভুসুকুপা বলেছেন— "সহজানন্দ মহাসুহ লীলে"।
- সাহিত্যে রূপক ধর্মমত: পদকর্তারা যে ধর্মমত প্রকাশ করেছেন, তা ছিল অনুভূতি ও সংকেতের রূপক। ফলে এখানে ধর্মতত্ত্ব এবং সাহিত্যরস একাকার হয়ে মিশে গেছে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদের গুরুত্ব:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বের বিচারে চর্যাপদের গুরুত্ব অপরিসীম:
- প্রাচীনতম প্রামাণ্য ভিত্তি: চর্যাপদ আবিষ্কৃত না হলে বাংলা সাহিত্যের লিখিত ইতিহাস শুরু হতো ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তী সময় থেকে এবং বাংলা ভাষার স্তরবিন্যাস নিয়ে গবেষণাকার্য দুরূহ হয়ে পড়তো।
- নব্য ভারতীয় আর্যভাষার প্রথম সাহিত্য: শুধু বাংলা নয়, সমগ্র নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাসমূহের (Modern Indo-Aryan Languages) মধ্যে চর্যাপদই হলো প্রাচীনতম লিখিত সাহিত্য।
- ছন্দ ও অন্ত্যমিলের আদি উৎস: আধুনিক বাংলা কবিতার ছন্দের অন্ত্যমিল ও মাত্রাবৃত্ত রীতির প্রত্যক্ষ আদিম উৎস নিহিত রয়েছে চর্যাপদে।
- শব্দভাণ্ডারের রূপান্তর: বহু বাংলা শব্দের ব্যুৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা অনুসন্ধানে চর্যাপদ প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শেকড়: প্রাচীন বাংলার কৃষিকাজ, ফুল-ফল, গৃহস্থালির আসবাবপত্র, খাদ্যরীতি, অলংকার, নদীনালা এবং লোকাচারের জীবন্ত বিবরণ চর্যাপদে মেলে, যার মাধ্যমে বাঙালি জাতি তাদের আদিম জাতিসত্তার শেকড়ের সন্ধান পায়।
নবচর্যাপদ ও নতুন চর্যাপদ গবেষণা
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক চর্যাপদ আবিষ্কারের পর আধুনিক যুগেও চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তীকালে '' ও '' আবিষ্কৃত হয়।
১. নবচর্যাপদ:
- আবিষ্কার ও সংগ্রাহক: গবেষক শশীভূষণ দাশগুপ্ত ১৯৬৩ সালে নেপাল এবং তরাই অঞ্চল থেকে চর্যাপদের অনুরূপ ২৫০টি পদ আবিষ্কার ও সংগ্রহ করেন।
- সংকলন ও প্রকাশনা: শশীভূষণ দাশগুপ্ত সংগৃহীত পদগুলোর মধ্য থেকে ১০০টি পদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেগুলোর মধ্য থেকে ৯৮টি পদ সংকলন করে 'নবচর্যাপদ' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।
- রচনাকাল: ের পদগুলোর রচনাকাল আনুমানিক দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যবর্তী সময় বলে বিবেচনা করা হয়।
২. নতুন চর্যাপদ:
প্রাচীন যুগের সাহিত্য নিদর্শন চর্যাপদ প্রকাশের একশত বছর পূর্ণ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও ফোকলোরবিদ ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ চর্যাপদ গবেষণায় এক যুগান্তকারী সংযোজন ঘটান।
- আবিষ্কারের ইতিহাস: ২০০৮ সালে ড. কাঠমান্ডু ও আশেপাশের বিভিন্ন বজ্রযানী মন্দিরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে রত্নকাজী বজ্রাচার্যের নিকট থেকে 'ের' দুটি সংকলিত পুস্তক সংগ্রহ করেন। পুস্তক দুটির পদগুলো নেওয়ারিমিশ্রিত দেবনাগরী লিপিতে লিপিবদ্ধ ছিল।
- প্রকাশনা ও উৎসর্গ: ২০১৭ সালে অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমি থেকে 'নতুন চর্যাপদ' গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে।
- বিষয়বস্তু: মূলত বজ্রযানী দেবদেবীর আরাধনার গীত। এতে তান্ত্রিক বিভিন্ন দেবদেবীর রূপসৌন্দর্য, মুখ ও বাহুর বর্ণনা, তাঁদের আসন, মুদ্রা, দেহভঙ্গি, আভরণ ও আয়ুধ সম্পর্কিত বিশদ তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও গুরুত্ব: ে সংকলিত পদগুলোর রচনাকাল অষ্টম থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি প্রমাণ করে যে চর্যাপদ কেবল প্রাচীন যুগেরই সৃষ্টি নয়, বরং মধ্যযুগ ও আধুনিক বিংশ শতকেও এর রচনাধারা জীবন্ত ও অব্যাহত ছিল।
- পদসংখ্যা:
- ড. সংকলিত মূল অংশে পদের সংখ্যা: ৩৩৫টি।
- পরিশিষ্ট অংশে সংগৃহীত পদসমূহ:
- রাহুল সাংকৃত্যায়ন সংগৃহীত: ২০টি
- শশীভূষণ দাশগুপ্ত সংগৃহীত: ২১টি
- জগন্নাথ উপাধ্যায় সংগৃহীত: ৩৭টি
- সর্বমোট নতুন চর্যাপদের পদসংখ্যা: ৪১৩টি।
- ভূমিকায় আলোচিত ৪টি প্রধান ভাগ:
- প্রথম অংশ: 'নতুন চর্যার সংগ্রহ ও চর্যাকার পরিচয়'
- দ্বিতীয় অংশ: 'নতুন চর্যায় বজ্রযানী দেবদেবী'
- তৃতীয় অংশ: 'নতুন চর্যার আঙ্গিক, ভাষা ও ভূগোল'
- চতুর্থ অংশ: 'চর্যাপদ ও নতুন চর্যা'
অধ্যায়টি পড়া সম্পন্ন হয়েছে?
কুইজ প্রশ্নের মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করুন অথবা ফ্ল্যাশকার্ড দিয়ে দ্রুত রিভিশন দিন।