বাংলা ভাষার উদ্ভব, বিকাশ ও যুগবিভাগ
Origin, Evolution and Periodization of Bengali Language and Literature
বাঙালি জাতির নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন, ব্রাহ্মী লিপি থেকে বাংলা লিপির ক্রমবিকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক যুগবিভাগের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
বাঙালি জাতি ও নৃগোষ্ঠীর পরিচয়
বাঙালি একটি । স্থানীয় আদিম বাসিন্দাদের সাথে বহিরাগত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে আজকের বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে। নৃগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- প্রাক-আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠী
- আর্য নরগোষ্ঠী
আর্যপূর্ব অনার্য জনগোষ্ঠীর চার শাখা:
আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলায় বসবাসকারী অনার্য জনগোষ্ঠী মূলত চারটি প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল:
- নেগ্রিটো (Negrito): বাংলার আদিমতম অধিবাসী।
- অস্ট্রিক (Austric): প্রায় ৫-৬ হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে বাংলায় প্রবেশ করে নেগ্রিটোদের পরাজিত ও বিতাড়িত করে বসতি গড়ে তোলে।
- দ্রাবিড় (Dravidian): সমসাময়িক কালে উত্তর-পশ্চিমের খাইবার গিরিপথ দিয়ে বাংলায় আসে। দ্রাবিড়রা সভ্যতায় অপেক্ষাকৃত উন্নততর হওয়ায় তারা র ওপর সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে।
- ভোটচীনীয় (Tibeto-Chinese): উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলায় আগমন করে।
বাঙালি জাতির ভিত্তি: মূলত অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় জাতির শারীরিক ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণেই আর্যপূর্ব বাঙালি জাতির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
আর্যদের আগমন ও মিশ্র জাতির বিকাশ:
- ভারতে আগমন: আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে মধ্য এশিয়ার ককেশীয় অঞ্চল থেকে শ্বেতকায় ইন্দো-ইউরোপীয় আর্যগোষ্ঠী আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে।
- বাংলায় প্রবেশ: খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে আর্যরা বাংলায় প্রবেশ করে।
- সংকরায়ণ: সে সময় বাংলায় বসবাসকারী অনার্য অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষ (যারা মূলত অস্ট্রিক নামে পরিচিত ছিল) সভ্যতায় আর্যদের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। আর্যগণ অস্ট্রিকদের পরাজিত করে বাংলা দখল করে নেয়। কালক্রমে আর্য ও অনার্য আদিম অধিবাসীদের রক্ত ও সংস্কৃতির মিলনে সৃষ্টি হয় এক নতুন মিশ্র জাতি, যা ইতিহাসে ‘বাঙালি জাতি’ নামে পরিচিত।
প্রাচীন জনপদ ও ভৌগোলিক ঐক্য:
- ‘বঙ্গ’ নামের প্রাচীন উল্লেখ: প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘ঋগ্বেদ’ এবং ‘মৎস্যপুরাণ’-এ সর্বপ্রথম 'বঙ্গ' জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
- জনপদের একীকরণ: খ্রিষ্টের জন্মের পর থেকে প্রায় সাতশত বছর পর্যন্ত বাংলা বিভিন্ন স্বাধীন জনপদে (যেমন: গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, পুণ্ড্র ইত্যাদি) বিভক্ত ছিল।
- রাজনৈতিক ঐক্য: প্রথমে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এবং পরবর্তীতে পাল বংশের রাজারা এই সকল জনপদকে একক শাসনের অধীনে একীভূত করেন।
- ‘সুবা-বাঙলা’ নামকরণ: মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে সমগ্র জনপদকে একক প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এর নাম দেওয়া হয় ‘সুবা-বাঙলা’।
বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ
ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালি জাতি যেমন একটি সংকর জাতি, তেমনি বাংলা ভাষাও বহু ভাষার সংকরায়ণ ও দীর্ঘ বিবর্তনের ফসল। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম শাখা হিসেবে বাংলা ভাষা বিবর্তিত হয়েছে।
ভাষার সংজ্ঞা ও মূল উপাদান: মানুষের মুখে উচ্চারিত অর্থবোধক ও মনোভাব প্রকাশক ধ্বনিসমষ্টিকে ভাষা বলে। মনের ভাব প্রকাশের মূল মাধ্যম ভাষা এবং ভাষার মূল উপাদান হলো ধ্বনি।
বৈদিক ভাষা থেকে সংস্কৃত ও প্রাকৃত:
- বৈদিক ভাষা: প্রাচীন আর্যদের ধর্মগ্রন্থ 'বেদ'-এর ভাষা ছিল বৈদিক ভাষা। দেবদেবীর পূজা ও যজ্ঞে ব্যবহৃত এই ভাষা কালক্রমে উচ্চারণের অপপ্রয়োগ, আঞ্চলিক শব্দের অন্তর্ভুক্তি ও বিকৃতির ফলে ক্রমেই অপ্রচলিত হয়ে পড়ে।
- সংস্কৃত ভাষা: খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের বিখ্যাত বৈয়াকরণ পাণিনি বৈদিক ভাষার সংস্কার সাধন করেন এবং কঠোর ব্যাকরণিক নিয়ম ও সূত্র প্রদান করেন। এই সংস্কারকৃত পরিশোধিত ভাষাই ‘সংস্কৃত ভাষা’। কখনোই সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা ছিল না; এটি ছিল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের শাস্ত্রীয় ও আনুষ্ঠানিক ভাষা।
- প্রাকৃত ভাষা: সাধারণ মানুষের মুখের স্বাভাবিক ও কথ্য ভাষাকে বলা হতো ‘প্রাকৃত ভাষা’ ('প্রাকৃত' শব্দের অর্থ স্বাভাবিক বা জনগণের ভাষা)।
- অপভ্রংশ ও অবহটঠ: থেকে কালক্রমে 'পালি' ও '' ভাষার জন্ম হয়। সাধুভাষা থেকে ভ্রষ্ট বা বিকৃতভাবে উচ্চারিত শব্দই হলো । বৈয়াকরণ পতঞ্জলির মতে— "বিশেষ ভাষার বিচ্যুত বা বিকৃত ভাবই অপভ্রংশ"। ের শেষ স্তর এবং নব্য ভারতীয় আর্যভাষার অন্তর্বর্তী রূপকে বলা হয় 'অবহটঠ'। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ের বিস্তারকাল ছিল। বাংলা ভাষা এই ের নিকট প্রত্যক্ষভাবে ঋণী।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও কালসীমা সম্পর্কিত মতভেদ:
| ভাষাতাত্ত্বিক | উৎপত্তির সময় | উৎস প্রাকৃত স্তর | আদি স্তরের স্থিতিকাল |
|---|---|---|---|
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ | সপ্তম শতাব্দী (৬৫০ খ্রি.) | ও গৌড়ী | সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী (৬৫০–১২০০ খ্রি.) |
| ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় | দশম শতাব্দী (৯৫০ খ্রি.) | মাগধী প্রাকৃত ও মাগধী | দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী (৯৫০–১২০০/১৩৫০ খ্রি.) |
| স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন | দশম শতাব্দী | মাগধী প্রাকৃত | — |
গৌড়ী প্রাকৃত ও মাগধী প্রাকৃতের ধারণা:
- গৌড়ী প্রাকৃত: 'গৌড়ী' একটি অঞ্চল (প্রাচীন গৌড় রাজ্য বা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) এবং 'প্রাকৃত' হলো মধ্য ভারতীয় আর্য কথ্য ভাষা। আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত আচার্য দণ্ডীর 'কাব্যাদর্শ' গ্রন্থে ভাষার সুনির্দিষ্ট উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ড. শহীদুল্লাহর মতে এটিই বাংলার জননী।
- মাগধী প্রাকৃত ও বঙ্গ-কামরূপী: গ্রিয়ারসন ও সুনীতিকুমারের মতে মগধ অঞ্চলের প্রাকৃত থেকে মাগধী এবং তা থেকে 'বঙ্গ-কামরূপী' শাখার মাধ্যমে বাংলা ও অসমিয়া ভাষার উদ্ভব হয়েছে।
- প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন: বাংলা ভাষার লিখিত রূপের প্রাচীনতম প্রামাণ্য নিদর্শন হলো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত গান সংকলন 'চর্যাপদ'।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ ও শ্রেণিবিভাগ
পৃথিবীর বর্তমান প্রায় সাড়ে তিন হাজার (৩৫০০+) ভাষাকে কয়েকটি বৃহৎ ভাষাবংশে বা ভাষাবৃক্ষে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো:
- ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)
- চীনা-তিব্বতীয় (Sino-Tibetan)
- আফ্রিকীয় (African)
- সেমীয়-হেমীয় (Semitic-Hamitic)
- দ্রাবিড়ীয় (Dravidian)
- অস্ট্রো-এশীয় (Austro-Asiatic)
- ককেশীয় (Caucasian)
- মালয়-পলিনেশীয় (Malayo-Polynesian)
অস্ট্রো-এশীয় ভাষা পরিবার: ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর (যেমন সাঁওতাল ও খাসিয়া) ভাষা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা ও তার শাখাসমূহ:
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ বছর পূর্বে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ইন্দো-ইউরোপীয় মূলভাষার উদ্ভব ঘটে বলে ধারণা করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শুরু করে সমগ্র ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত অধিকাংশ ভাষা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, পর্তুগিজ, ফারসি, হিন্দি, উর্দু, নেপালি, সিংহলি এবং আমাদের মাতৃভাষা বাংলা— সবই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য।
প্রধানত ২টি শাখায় এবং ৮টি মূল উপশাখায় বিভক্ত:
-
কেন্তুম (Centum) শাখা (পাশ্চাত্য শাখা):
- গ্রিক
- ইতালিক (ল্যাটিন)
- কেলটিক
- জার্মানিক (এশিয়া অঞ্চলে প্রচলিত বিলুপ্ত উপশাখা: হিত্তীয় ও তুখারিক)
-
শতম (Satem) শাখা (প্রাচ্য শাখা):
- আর্য বা ইন্দো-ইরানীয় (যা থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব)
- বাল্টো-স্লাভিক
- আর্মেনীয়
- আলবেনীয়
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ইউরোপীয় ভাষাগুলো মূলত কেন্তুম এবং এশীয়-আর্য ভাষাগুলো র অন্তর্ভুক্ত। বাংলা ভাষার উদ্ভব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার 'শতম' শাখা থেকে।
ঋগ্বেদ ও প্রাচীন আর্য সাহিত্যের নিদর্শন:
- ঋগ্বেদ: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় রচিত প্রাচীনতম লিখিত ধর্মগ্রন্থগুলোর অন্যতম। এটি প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃত স্তোত্র সংকলন।
- রচয়িতা ও সংকলক: এর রচয়িতা হিসেবে ৩৭৮ জনের নাম পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৫০ জন ঋষি এবং ২৮ জন বিদুষী নারী বা 'ঋষিকা'। এর সংকলক ছিলেন মহর্ষি পরাশরপুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন (বেদব্যাস)।
- ছন্দ: গ্রন্থটি ৭টি মৌলিক ছন্দ এবং প্রায় ৪০টি মিশ্র ছন্দে রচিত।
টীকা: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ভাষাচিত্রে তারকাচিহ্ন (*) দিয়ে আনুমানিক/অনুমিত ভাষা এবং যোগচিহ্ন (+) দিয়ে বিলুপ্ত/মৃত ভাষাকে নির্দেশ করেছেন।
বাংলা লিপি ও তার বিবর্তন
লিপি হলো ভাষার লিখিত রূপ বা লিখন পদ্ধতি। পৃথিবীর প্রায় সকল বর্ণমালার লিপিই প্রাচীন ফিনিশীয় লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। প্রাচীন ভারতে প্রচলিত চিত্রলিপি বা সিন্ধু লিপি থেকে পরবর্তীকালে ভারতীয় লিপিমালার বিকাশ ঘটে।
প্রাচীন ভারতীয় লিপির রূপভেদ:
প্রাচীন ভারতে প্রধানত দুটি লিপির প্রচলন ছিল:
- ব্রাহ্মী লিপি: ভারতের মৌলিক লিপি। এটি বাম দিক থেকে ডান দিকে লেখা হতো (যেমন: বাংলা, দেবনাগরী/হিন্দি, অসমিয়া)।
- খরোষ্ঠী লিপি: এটি ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হতো (যেমন: আরবি, ফারসি, উর্দু)।
ব্রাহ্মী লিপির বিকাশ ও আঞ্চলিক বিস্তার:
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বর্ণমালার নির্ভরযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের অনুশাসনে এবং বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত শিলালিপিতে। সম্রাট অশোকের অধিকাংশ অনুশাসন তে উৎকীর্ণ।
কুষাণ ও গুপ্ত রাজাদের আমলে তিনটি আঞ্চলিক রূপ পরিগ্রহ করে:
- সারদা লিপি: উত্তর-পশ্চিম ভারতে (কাশ্মীর ও পাঞ্জাব অঞ্চলে) প্রচলিত রূপ।
- নাগরী লিপি: পশ্চিম ও মধ্য ভারতে (রাজস্থান, গুজরাট, মালব ও মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে) প্রচলিত রূপ।
- কুটিল লিপি: পূর্ব ভারতে (বাংলা, বিহার, আসাম, ওড়িশা অঞ্চলে) প্রচলিত রূপ।
বাংলা লিপির উৎপত্তি ও আধুনিক রূপায়ণ:
- উৎপত্তি: র কুটিল রূপের পূর্বাঞ্চলীয় সংস্করণ 'পূর্বী লিপি' থেকেই বাংলা লিপির প্রত্যক্ষ উদ্ভব হয়েছে। এটিই বাংলা ভাষার নিজস্ব লিপি।
- উৎপত্তির সময়: ড. শহীদুল্লাহর মতে সপ্তম শতাব্দীতে এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে দশম শতাব্দীতে বাংলা লিপির উৎপত্তি।
- ঐতিহাসিক পরিক্রমা:
- পাল আমল (৮ম–১২শ শতক): বাংলা লিপির ব্যাপক বিস্তার ও প্রচার ঘটে।
- সেন আমল (১২শ–১৩শ শতক): বাংলা লিপির স্থায়ী রূপ তৈরি ও সুনির্দিষ্ট বর্ণ গঠনের কাজ শুরু হয়।
- পাঠান/সুলতানি আমল: লিপি একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মুদ্রণযন্ত্র ও পঞ্চানন কর্মকার:
- ১৭৭৮ সালে চার্লস উইলকিন্সের নকশা অনুযায়ী পঞ্চানন কর্মকার সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষরের নিখুঁত ধাতব টাইপ প্রস্তুত করেন।
- ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনে মুদ্রণযন্ত্র (ছাপাখানা) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা লিপি স্থায়ী ও আধুনিক রূপ লাভ করে।
- বাংলা বর্ণমালা ও সংশ্লিষ্ট ভাষা:
- বাংলা বর্ণমালায় মোট মূল বর্ণ ৫০টি (স্বরবর্ণ ১১টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি)।
- বাংলা লিপি ব্যবহার করে অসমিয়া, বোড়ো, মণিপুরি ইত্যাদি ভাষাও লেখা হয়।
- একসময় সংস্কৃত ও মৈথিলি ভাষাও বাংলা লিপিতে লেখা হতো।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগবিভাগ
হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবাহিত বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাসকে গবেষক ও পণ্ডিতগণ মূলত তিনটি প্রধান যুগে বিভক্ত করেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সামাজিক চেতনার বিকাশকে কেন্দ্র করে এই যুগবিভাগ নির্ধারিত হয়েছে।
যুগবিভাগের ঐতিহাসিক মাইলফলক:
বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে:
- ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ: ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়, যা মধ্যযুগের প্রারম্ভকাল হিসেবে বিবেচিত।
- ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ: কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা গদ্যচর্চা ও পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়, যা আধুনিক যুগের সূচনা নির্দেশ করে।
সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য: রস বিচারে প্রাচীন ও ের কাব্যে মূলত ভাষার পার্থক্য থাকলেও বিষয়ের দিক থেকে উভয় যুগই ছিল ধর্ম ও দেবদেবী নির্ভর। ে এসে সাহিত্য ধর্মনিরপেক্ষ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, মানবতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী রূপ ধারণ করে।
বাংলা সাহিত্যের প্রধান তিন যুগের সময়সীমা:
| যুগের নাম | সময়কাল (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) | সময়কাল (ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়) | প্রধান সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শন |
|---|---|---|---|
| ১. প্রাচীন যুগ (আদি যুগ) | ৬৫০ – ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ | ৯৫০ – ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ | • একমাত্র নিদর্শন: চর্যাপদ • ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাধনসঙ্গীত ও বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব |
| ২. মধ্যযুগ | ১২০১ – ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ | ১২০১ – ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ | • সম্পূর্ণ ধর্ম ও দেবদেবী নির্ভর • মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, প্রণয়োপাখ্যান, অনুবাদ |
| ৩. আধুনিক যুগ | ১৮০১ – বর্তমান | ১৮০১ – বর্তমান | • মানবতাবাদ, ইহজাগতিকতা, যুক্তি ও আত্মচেতনা • ১৮৬০ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে পূর্ণ বিকাশ |
মধ্যযুগের উপ-বিভাগসমূহ:
কে (১২০১–১৮০০ খ্রি.) শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব ও প্রভাবের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
- প্রাক-চৈতন্য যুগ (১২০১–১৫০০ খ্রি.): অন্ধকার যুগ বা তুর্কি বিজয়ের যুগোত্তর প্রাথমিক বিকাশকাল (যেমন: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য)।
- চৈতন্য যুগ (১৫০১–১৬০০ খ্রি.): বৈষ্ণব সাহিত্যের স্বর্ণযুগ ও চৈতন্য জীবনীকাব্যের বিকাশ।
- চৈতন্য-পরবর্তী যুগ (১৬০১–১৮০০ খ্রি.): মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, শাক্ত পদাবলি ও অনুবাদ সাহিত্যের প্রাচুর্য।
মধ্যযুগের কাব্যের প্রধান ৪টি ধারা:
- ক. মঙ্গলকাব্য (মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল)
- খ. বৈষ্ণব পদাবলি (শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমলীলা বিষয়ক পদাবলী)
- গ. রোমান্সধর্মী প্রণয়োপাখ্যান (ইউসুফ-জোলেখা, পদ্মাবতী ইত্যাদি)
- ঘ. অনুবাদ সাহিত্য (রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতের অনুবাদ)
বিশিষ্ট গবেষকদের স্বতন্ত্র যুগবিভাগ:
১. দীনেশচন্দ্র সেন ('বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' — বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থ):
- হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ: (৮০০ – ১২০০ খ্রি.)
- গৌড়ীয় যুগ বা চৈতন্যপূর্ব যুগ: (১২০০ – ১৫০০ খ্রি.)
- চৈতন্যসাহিত্য বা নবদ্বীপের যুগ: (১৫০০ – ১৬০০ খ্রি.)
- সংস্কার যুগ: (১৬০০ – ১৭০০ খ্রি.)
- কৃষ্ণচন্দ্রীয় যুগ বা নবদ্বীপের দ্বিতীয় যুগ: (১৭০০ – ১৮০০ খ্রি.)
২. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ('ODBL' গ্রন্থ):
- প্রাচীন যুগ বা মুসলমানপূর্ব যুগ: (৯৫০ – ১২০০ খ্রি.)
- তুর্কি বিজয়ের যুগ: (১২০০ – ১৩০০ খ্রি.)
- আদি মধ্যযুগ বা প্রাকচৈতন্য যুগ: (১৩০০ – ১৫০০ খ্রি.)
- অন্ত্য মধ্যযুগ: (১৫০০ – ১৮০০ খ্রি.) [চৈতন্যযুগ (১৫০০–১৭০০ খ্রি.) ও নবাবী আমল (১৭০০–১৮০০ খ্রি.)]
- আধুনিক যুগ: (১৮০০ – বর্তমান)
অধ্যায়টি পড়া সম্পন্ন হয়েছে?
কুইজ প্রশ্নের মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করুন অথবা ফ্ল্যাশকার্ড দিয়ে দ্রুত রিভিশন দিন।