মধ্যযুগ (বাংলা সাহিত্য)
Middle Age (Bangla Literature)
১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ হলো ধর্ম ও লোকায়ত মানবচেতনার এক বর্ণাঢ্য বিকাশপর্ব, যার সূচনা ঘটে তুর্কি বিজয়ের পরবর্তী অন্ধকার যুগ ও বড়ু চণ্ডীদাসের কালজয়ী 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের মাধ্যমে। এ যুগে বৈষ্ণব পদাবলির গভীর মরমি প্রেমদর্শন, মঙ্গলকাব্যের দেবদেবী ও লৌকিক সমাজবাস্তবতা, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাবে জীবনী সাহিত্য, নাথ ও মর্সিয়া সাহিত্য এবং লোকায়ত গীতিকা ধারার অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি ঘটে। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের নাগরিক কাব্যচেতনার মাধ্যমে মধ্যযুগের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং আধুনিক সাহিত্যের দ্বার উন্মোচিত হয়।
মধ্যযুগের সূচনা, যুগবিভাগ ও অন্ধকার যুগ (১২০১–১৩৫০ খ্রি.)
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে মধ্যযুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। মধ্যযুগের প্রারম্ভে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত ঘটে।
মধ্যযুগের সময়কাল ও সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- সময়সীমা: ১২০১ – ১৮০০ সাল।
- স্বর্ণালি সময়: মোগল যুগ-কে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণালি সময় বলা হয়।
- কাব্যের দুটি প্রধান ধারা:
- কাহিনিকাব্য: এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো আখ্যান কাঠামোর মধ্যে সংগীতধর্মিতা।
- গীতিকাব্য: এর প্রধান লক্ষণ হলো ভাবধর্মিতা ও তীব্র সংগীতধর্মিতা।
- কাব্যের চারটি প্রধান শাখা:
- ক. মঙ্গলকাব্য
- খ. বৈষ্ণব পদাবলি
- গ. রোমান্সধর্মী প্রণয়োপাখ্যান
- ঘ. অনুবাদ সাহিত্য
- গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক: মধ্যযুগের প্রথম কাব্য হলো বড়ু চণ্ডীদাসের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' এবং মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্যধারা হলো 'বৈষ্ণব পদাবলি'।
মধ্যযুগের ঐতিহাসিক যুগবিভাগ:
১. শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনী ভিত্তিক যুগবিভাগ:
| যুগের নাম | সময়কাল | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| প্রাক-চৈতন্য যুগ | ১২০১ – ১৫০০ খ্রি. | ও আদি মধ্যযুগের সাহিত্য ('শ্রীকৃষ্ণকীর্তন') |
| চৈতন্য যুগ | ১৫০১ – ১৬০০ খ্রি. | বৈষ্ণব পদাবলি ও চৈতন্য জীবনীকাব্যের স্বর্ণযুগ |
| চৈতন্য-পরবর্তী যুগ | ১৬০১ – ১৮০০ খ্রি. | মঙ্গলকাব্য, প্রণয়োপাখ্যান, শাক্ত পদাবলি ও অনুবাদ সাহিত্য |
২. মুসলিম শাসনামল ভিত্তিক যুগবিভাগ:
- তুর্কি যুগ: ১২০১ – ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ।
- সুলতানি যুগ: ১৩৫১ – ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।
- মোগল যুগ: ১৫৭৬ – ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ।
৩. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যুগবিভাগ:
- পাঠান আমল: ১২০১ – ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ।
- মুঘল আমল: ১৫৭৭ – ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ।
বাংলা সাহিত্যে ‘অন্ধকার যুগ’ (১২০০–১৩৫০ খ্রি.):
১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের ফলে বাংলার প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধশক্তির নেতৃত্ব চলে যায় মুসলিম শাসকদের হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সাময়িকভাবে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা ও বিমূঢ় অবস্থার কারণে ১২০০ থেকে ১৩৫০ সাল (তুর্কি শাসনামল) পর্যন্ত প্রায় দেড়শত বছর উল্লেখযোগ্য কোনো বাংলা সাহিত্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাই ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ এ সময়কালকে 'অন্ধকার যুগ' বলে অভিহিত করেন।
অন্ধকার যুগ সম্পর্কিত গবেষকদের মতামত:
- ড. হুমায়ুন আজাদ: "১২০০ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত কোনো সাহিত্যকর্মের পরিচয় পাওয়া যায় না বলে এ সময়টাকে বলা হয় অন্ধকার যুগ।"
- ড. ওয়াকিল আহমদ: "প্রথমে সেন ও পরে পাঠান আমলে সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পটভূমি পরিবর্তিত হলে সহজিয়া সম্প্রদায়ের বিলুপ্তি ঘটে। ফলে তাদের ধর্মসাধনা ও জ্ঞানসাধনা রুদ্ধ হয়; সেই সাথে বাংলা সাহিত্য চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, কেননা ঐ যুগে সহজিয়াগণই বাংলা ভাষার একমাত্র ধারক ও বাহক ছিলেন।"
- পণ্ডিতদের সিদ্ধান্ত: এ যুগে যে দুই-একটি গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত ছিল না (সংস্কৃত বা প্রাকৃত ভাষায় রচিত)। বাংলা সাহিত্যের অনুপস্থিতির কারণেই এ সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের বলা হয়।
অন্ধকার যুগের সাহিত্যিক নিদর্শনসমূহ:
-
'প্রাকৃতপৈঙ্গল':
- রচয়িতা: শ্রীহর্ষ।
- রচনাকাল: ত্রয়োদশ শতক।
- ভাষা ও ধরন: প্রাকৃত ভাষায় রচিত ের প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন; এটি একটি সমৃদ্ধ গীতিকবিতার মহাসঙ্কলন।
-
'শূন্যপুরাণ':
- রচয়িতা: রামাই পণ্ডিত।
- অধ্যায় সংখ্যা: মোট ৫১টি অধ্যায় (প্রথম ৫টি অধ্যায়ে সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা এবং শেষ ৪৬টি অধ্যায়ে ধর্মপূজার রীতি-পদ্ধতি বর্ণিত)।
- গঠনরীতি: সংস্কৃত ও বাংলা মিশ্রিত গদ্য-পদ্যের চম্পুকাব্য।
- বিষয়বস্তু ও প্রকাশনা: এতে বৌদ্ধ শূন্যবাদ ও হিন্দুদের লৌকিক ধর্মের মিশ্রণ ঘটেছে। শূন্যময় দেবতা ধর্মঠাকুরের পূজা পদ্ধতি বর্ণিত হওয়ায় এর নাম ''। পণ্ডিত নগেন্দ্রনাথ বসু তিনটি পুঁথিপাঠ সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশ করেন।
- 'নিরঞ্জনের রুষ্ম' (নিরঞ্জনের রুশ্ম): এ গ্রন্থের অন্তর্গত একটি বিখ্যাত কবিতা, যাতে ব্রাহ্মণ্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি সাধারণ অন্ত্যজ মানুষের স্বস্তির মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
-
'সেক শুভোদয়া' (Sek Shubhodaya):
- রচয়িতা: রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্র।
- অধ্যায় ও ভাষা: সংস্কৃত ভাষায় গদ্য-পদ্য মিশ্রিত ে মোট ২৫টি অধ্যায়ে রচিত।
- মূল উপজীব্য: শেখের শুভোদয় অর্থাৎ প্রখ্যাত সুফি সাধক শেখ জালালউদ্দিন তাব্রিজির মাহাত্ম্য ও অলৌকিক ক্ষমতার গৌরব প্রচার। এটি বাংলা ভাষায় রচিত পীর মাহাত্ম্যজ্ঞাপক কাব্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।
- প্রাচীন প্রেমসংগীত: এতে বর্ণিত একটি প্রেমসংগীতকে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র প্রেমসংগীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য ও মধ্যযুগের সমাজচিত্র
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের আদি বা প্রথম কবি বড়ু চণ্ডীদাস রচিত 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' হলো সর্বজনস্বীকৃত খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত মধ্যযুগের প্রথম কাব্য।
আবিষ্কার ও প্রকাশনার ঐতিহাসিক পরিক্রমা:
- আবিষ্কার (১৯০৯ খ্রি. / ১৩১৬ বঙ্গাব্দ): কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পুঁথিশালার অধ্যক্ষ বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বনবিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাঁকিল্যা (কালিয়া) গ্রামের শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশীয় দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় নামক এক ব্রাহ্মণের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচার ওপর থেকে এই প্রাচীন পুঁথি উদ্ধার করেন। বসন্তরঞ্জন রায়ের উপাধি ছিল 'বিদ্বদ্বল্লভ'।
- পুঁথির অবস্থা ও নামকরণ: হাতে লেখা পুঁথিখানির প্রথমে দুটি পাতা, মাঝের কয়েকটি পাতা এবং শেষের পাতাটি ছিন্ন থাকায় গ্রন্থের নাম ও রচনাকাল পাওয়া যায়নি। তবে পুঁথির সাথে প্রাপ্ত একটি চিরকূটে 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ' কথাটি লিখিত ছিল। পরবর্তীতে কাব্যের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে এর নাম রাখেন 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'।
- প্রকাশনা (১৯১৬ খ্রি. / ১৩২৩ বঙ্গাব্দ): বসন্তরঞ্জন রায়ের একক সম্পাদনায় কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে কাব্যটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে এটি কলকাতার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রোডের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পুঁথিশালায় সংরক্ষিত আছে।
- সহযোগী গবেষক: এ কাব্যের মূল্যবান মুখবন্ধ লেখেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং লিপিকাল ও প্রাচীনত্ব বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
রচনাকাল ও কলেবর:
- রচনাকাল বিতর্ক:
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে: আনুমানিক ১৪০০ সাল (চতুর্দশ শতাব্দী)।
- গোপাল হালদারের মতে: ১৪৫০ – ১৫০০ সালের মধ্যে (পঞ্চদশ শতাব্দী)।
- কাব্যবিন্যাস: কাব্যটি মোট ৪১৮টি পদ, ১৬১টি সংস্কৃত শ্লোক এবং ১৩টি খণ্ডে বিন্যস্ত।
কাব্যের প্রধান চরিত্র ও রূপক তত্ত্ব:
- কৃষ্ণ: পরমাত্মা বা ঈশ্বরের লৌকিক রূপক। তবে ধর্মগ্রন্থের দেবতা নয়— সে দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন, স্থূল ও তীব্র মানবিক আবেগে উদ্বেল এক কিশোর কৃষ্ণ।
- রাধা: জীবাত্মা বা সৃষ্টির রূপক। নপুংশক আইহন (আয়ান) গোপের সঙ্গে বিবাহিতা অতৃপ্ত এক তরুণী গোপকিশোরী, যার মধ্যে তীব্র কামাসক্তি ও লৌকিক আর্তি বিদ্যমান।
- বড়ায়ি: রাধা ও কৃষ্ণের মিলনের মধ্যস্থতাকারী বৃদ্ধা পিসি বা প্রেমের দূতি।
গঠনরীতি ও নাট্যলক্ষণ ('রাধাকৃষ্ণের ধামালী'):
- যাত্রাপালা ও নাট্যগীতিকাব্য: কাব্যটিতে সংস্কৃত 'গীতগোবিন্দম্'-এর অনুকরণে প্রচুর গীতি এবং চরিত্রগুলোর সংলাপবহুল নাট্যলক্ষণ বিদ্যমান থাকায় পণ্ডিতগণ একে নাট্যগীতিকাব্য বা 'নাট-গীত-পাঞ্চালি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
- ধামালী রীতি: ড. বিমানবিহারী মজুমদার একে 'রাধাকৃষ্ণের ধামালী' বলে উল্লেখ করেছেন। '' শব্দের অর্থ রঙ্গরস, পরিহাস বাক্য বা তামাশা। রঙ্গ-তামাশার ছলে কপট দম্ভ প্রকাশ করে যে উক্তি করা হয়, নাট্যপালায় তা হাস্যরসের উপকরণ জোগায়। কাব্যটিতে মোট ১২টি স্থানে '' শব্দের প্রয়োগ রয়েছে।
- ছন্দ: কাব্যটি মূলত পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচিত।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ১৩টি খণ্ডের কাহিনি সংক্ষেপ:
- ১. জন্ম খণ্ড: কংস রাজাকে বধ করার উদ্দেশ্যে দৈব নির্দেশে কৃষ্ণ দেবকী ও বাসুদেবের ঘরে জন্ম নিয়ে বৃন্দাবনে নন্দগোপের আশ্রয়ে লালিত হয়। অন্যদিকে রাধা পদ্মা ও সাগর গোয়ালার ঘরে জন্ম নিয়ে বাল্যকালে নপুংশক আইহন গোপের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়।
- ২. তাম্বুল খণ্ড: মথুরায় দুধ-দই বিক্রি করতে গিয়ে রাধা পথ হারালে কৃষ্ণের কাছে রাধার রূপ বর্ণনা করে। কৃষ্ণের পূর্বরাগ জাগে এবং সে র মাধ্যমে পান ও ফুলের উপহার পাঠায়; রাধা তা প্রত্যাখ্যান করে।
- ৩. দান খণ্ড: ঘাটে পারাপার শুল্ক বা দান হিসেবে কৃষ্ণ রাধার দেহমিলন দাবি করে পথ রোধ করে। রাধা উপায়ান্তর না দেখে নিজের রূপ বিনষ্টের চেষ্টা করে ও বনে পালায়, কিন্তু কৃষ্ণের হাতে ধরা পড়ে।
- ৪. নৌকা খণ্ড: রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চললে কৃষ্ণ মাঝির ছদ্মবেশে একাকী নৌকায় রাধাকে তুলে মাঝনদীতে নৌকা ডুবিয়ে রাধার সঙ্গ লাভ করে।
- ৫. ভার খণ্ড: রাধা ঘরবন্দি হলে কৃষ্ণ ছল করে মজুরের বেশে রাধার দুধ-দইয়ের বোঝা মাথায় তুলে মথুরায় নিয়ে যায় এবং পারিশ্রমিক হিসেবে আলিঙ্গন দাবি করে।
- ৬. ছত্র খণ্ড: মথুরা থেকে ফেরার পথে কৃষ্ণ রোদের মধ্যে ছাতা ধরে রাধার সেবা করে, কিন্তু রাধা চাতুর্যের সাথে কৃষ্ণকে বঞ্চিত করে।
- ৭. বৃন্দাবন খণ্ড: কৃষ্ণ কৌশল বদলে বৃন্দাবনকে অপূর্ব সাজে সাজায়; রাধা মুগ্ধ হয়ে পূর্বের ক্ষোভ ভুলে কৃষ্ণের সাথে প্রথমবার সানন্দে মিলিত হয়।
- ৮. কালিয়দমন খণ্ড: যমুনার বিষাক্ত কালিয়নাগকে বধ করতে কৃষ্ণ জলে ঝাঁপ দেয়। কৃষ্ণের বিপদে রাধার গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় এবং কৃষ্ণ বীরত্বে নাগকে দমন করে।
- ৯. যমুনা খণ্ড: রাধা যমুনায় জল আনতে গেলে কৃষ্ণ ডুব দিয়ে কদম গাছে লুকিয়ে বসে এবং রাধার খুলে রাখা বহুমূল্য হার চুরি করে।
- ১০. হার খণ্ড: হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের মা যশোদার কাছে নালিশ জানায়। কৃষ্ণ সম্পর্ককে মামি-ভাগ্নে বলে মিথ্যা দাবি করে; বিষয়টি সামাল দেয়।
- ১১. বাণ খণ্ড: নালিশে ক্ষুব্ধ কৃষ্ণের প্রতি রাধাকে আকৃষ্ট করতে র পরামর্শে কৃষ্ণ মদনবাণ নিক্ষেপ করে। রাধা বাণবিদ্ধ হয়ে মূর্ছিত হয় এবং কৃষ্ণের স্পর্শে চৈতন্য ফিরে পেয়ে চিরতরে কৃষ্ণপ্রেমে আত্মহারা হয়।
- ১২. বংশী খণ্ড: কৃষ্ণ বাঁশি বাজিয়ে রাধাকে পাগলপারা করে তোলে। রাধা শিয়রে রাখা বাঁশি চুরি করলে কৃষ্ণ র সাক্ষ্য নিয়ে রাধাকে চিরকাল ভালোবেসে পাশে রাখার অঙ্গীকার করে বাঁশি ফেরত নেয়।
- ১৩. বিরহ খণ্ড: কৃষ্ণ হঠাৎ রাধার প্রতি উদাসীন হয় এবং কংস বধের জন্য নিদ্রিতা রাধাকে বৃন্দাবনে একাকী ফেলে মথুরায় চলে যায়। কৃষ্ণবিরহে উন্মাদিনী রাধা কে মথুরায় পাঠালেও কৃষ্ণ রাধার অতীত কটূক্তির কথা স্মরণ করে আর ফিরে আসতে অস্বীকার করে। (কাব্যটি এখানেই খণ্ডিত ও অসমাপ্ত)।
কাব্যে প্রতিফলিত মধ্যযুগীয় গ্রামীণ সমাজচিত্র:
সাহিত্য সমাজের দর্পণ। '' কাব্যের পৌরাণিক কাঠামোর অন্তরালে ভাগীরথী নদীর তীরের সমকালীন বাঙালি লোকজীবনের নিখুঁত বাস্তব সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে:
- পেশাজীবী সমাজ: গোপ, কুমার, তেলী, নাপিত, মাঝি প্রভৃতি শ্রমজীবী ও সাধারণ অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা বর্ণিত হয়েছে।
- সামাজিক রীতি ও ব্যাধি: সমাজে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল (বালিকা বধূ রাধার বিবাহ)। যৌথ পরিবারে শাশুড়ি ও ননদের কঠোর অনুশাসনে গৃহবধূদের সর্বদা তটস্থ থাকতে হতো।
- লোকসংস্কৃতি ও ভাষা: গ্রামীণ নারী-পুরুষের মধ্যে কটূক্তি ও গালাগালির ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষ অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী ছিল ("ললাট লিখিত খণ্ডন না জাএ, সব মোর করমের ফল...")।
- আতিথেয়তা ও সামন্ত শাসন: সমাজে পান-সুপারি সহযোগে অতিথি আপ্যায়নের চল ছিল এবং কংসের অনুষঙ্গে ক্ষমতাশালীদের নিপীড়নের সামাজিক রূপ ফুটে উঠেছে।
বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য ও পদকর্তাগণ
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন হলো বৈষ্ণব পদাবলি। চতুর্দশ শতকের শেষভাগে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে এ ধারার উন্মেষ ঘটে এবং শ্রীচৈতন্যদেবের ধর্মদর্শনের প্রভাবে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এর চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়।
পদাবলি সাহিত্যের স্বরূপ ও তাৎপর্য:
- সংজ্ঞা: বৌদ্ধ বা বৈষ্ণব ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব ও প্রেমসাধনা নিয়ে দেবস্তুতি ও লীলাবিষয়ক রচিত গীতকবিতাকে পদ বা পদাবলি বলে।
- মহাজন পদাবলি: বৈষ্ণব সমাজে বৈষ্ণব পদকর্তাগণ 'মহাজন' এবং তাঁদের রচিত পদগুলো 'মহাজন পদাবলি' নামে পরিচিত।
- তাত্ত্বিক তাৎপর্য: এতে কৃষ্ণ পরমাত্মা বা ভগবানের প্রতীক এবং রাধা জীবাত্মা বা সৃষ্টির রূপক। ভক্ত ও ভগবানের নিবিড় প্রেমের মধ্য দিয়েই পরম মুক্তি লাভ পদাবলির মূল দর্শন।
- অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য: কেবল হিন্দু বা বৈষ্ণব নয়, অসংখ্য মুসলমান কবিও পরম ভাবাবেগে বৈষ্ণব পদ রচনা করেছেন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' গ্রন্থে ১৬৪ জন বৈষ্ণব পদকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন।
বৈষ্ণব পদাবলির পঞ্চরস:
বৈষ্ণব রসশাস্ত্রে রাধাকৃষ্ণের ভক্তি ও প্রেমসম্পর্ককে ৫টি রসে বিন্যস্ত করা হয়েছে:
- শান্ত রস: ঈশ্বর ভাবনায় চিত্তের স্থিরতা ও শ্রদ্ধা।
- দাস্য রস: ঈশ্বরকে প্রভু এবং নিজেকে তাঁর অনুগত ভৃত্য মনে করা।
- সখ্য রস: ঈশ্বরকে পরম বন্ধু বা সখা হিসেবে ভালোবাসা।
- বাৎসল্য রস: ঈশ্বরকে নিজ সন্তান স্নেহে লালন ও মমতা প্রদান করা (যশোদার ভাব)।
- মধুর রস (শৃঙ্গার রস): ঈশ্বরকে পতি বা প্রাণবল্লভ এবং ভক্ত নিজেকে প্রেয়সী জ্ঞানে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। তে মধুর রসই সর্বশ্রেষ্ঠ। (উল্লেখ্য, সামগ্রিক অলঙ্কারশাস্ত্রে কাব্যরস ৯ প্রকার)।
ব্রজবুলি ভাষা (কৃত্রিম কবিভাষা):
- সংজ্ঞা: বাংলা ও মৈথিলি ভাষার সুষম সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক বিশেষ কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষাকে 'ব্রজবুলি' বলে। এতে কিছু প্রাচীন হিন্দি শব্দের প্রভাবও রয়েছে।
- প্রবর্তক: মিথিলার কবি বিদ্যাপতি এই ভাষার স্রষ্টা ও প্রথম সফল প্রয়োগকারী।
- বৈশিষ্ট্য: কখনো কোনো অঞ্চলের মানুষের মুখের কথ্য ভাষা ছিল না; কেবল কাব্য ও গীত রচনার বাহন হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুকুমার সেনের মতে, অবহটঠ স্তর থেকে র উদ্ভব হয়েছে।
- প্রয়োগকারী কবিগণ: , চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ পদকর্তা তে কালজয়ী পদ রচনা করেছেন। আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভাষায় 'ভানুরসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' রচনা করেন।
প্রধান বৈষ্ণব পদাবলি সংকলন গ্রন্থসমূহ:
- 'ক্ষণদাগীতচিন্তামণি': সপ্তদশ শতকের শেষভাগে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী সংকলিত প্রাচীনতম পদাবলি সংকলন।
- 'পদকল্পতরু': বৈষ্ণবদাস ওরফে গোকুলানন্দ সেন সংকলিত পদাবলির বৃহত্তম ও সর্বাধিক সমাদৃত সংকলন গ্রন্থ (এতে মোট ৩১০১টি পদ সংকলিত হয়েছে)।
- 'পদসমুদ্র': ষোড়শ শতকের শেষার্ধে বাবা আউল মনোহর দাস কর্তৃক সংকলিত বৃহৎ গ্রন্থ (এতে প্রায় ১৫ হাজার পদ সংকলিত ছিল)।
বিশিষ্ট বৈষ্ণব পদকর্তাগণ:
১. কবি জয়দেব (আদি পদকর্তা):
- সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের পঞ্চরত্ন সভার অন্যতম সভাকবি।
- দ্বাদশ শতকে সংস্কৃত ভাষায় রচিত তাঁর অমর গীতিগ্রন্থ 'গীতগোবিন্দম্' (১২টি সর্গ, ২৮৬টি শ্লোক ও ২৪টি গীত)। তিনিই প্রথম 'পদাবলি' শব্দটি প্রয়োগ করেন।
২. বিদ্যাপতি (মৈথিল কোকিল):
- মিথিলার দ্বারভাঙার বিসফী গ্রামের অধিবাসী এবং মিথিলার রাজা শিবসিংহের সভাকবি।
- তাঁকে 'মৈথিল কোকিল', 'কবিকণ্ঠহার', 'অভিনব জয়দেব' ও 'নব জয়দেব' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
- বাংলা ভাষায় একটি পঙ্ক্তিও না লিখে কেবল তে পদ রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি র আদি কবি ও পদসংগীতের রূপকার।
৩. চণ্ডীদাস (বাংলায় পদাবলির আদি কবি):
- বাংলা ভাষায় র আদি বা প্রথম রচয়িতা।
- তাঁর পদে মরমি আকুলতা ও ভাবসাধনার প্রাধান্য ছিল।
৪. ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ (Chandidas Problem):
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীদাস ভণিতায় বহু পদ ও কাব্য পাওয়া যাওয়ায় চণ্ডীদাস একজন ব্যক্তি নাকি একাধিক ব্যক্তি— এ নিয়ে তীব্র গবেষক বিতর্ক তৈরি হয়, যা '' নামে খ্যাত:
- ড. আহমদ শরীফের মতে ৩ জন: অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস (সর্বপ্রাচীন), চণ্ডীদাস ও দীন চণ্ডীদাস।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ৩ জন: বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস ও দীন চণ্ডীদাস।
- ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. সুকুমার সেনের মতে ২ জন: বড়ু চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস।
৫. জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস:
- জ্ঞানদাস (১৫৬০ খ্রি.): বর্ধমানের কাঁদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য। চণ্ডীদাস ছিলেন স্বভাবজাত 'সাধক' এবং জ্ঞানদাস ছিলেন সচেতন 'শিল্পী'।
- গোবিন্দদাস (আসল পদবি সেন): র ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত পদকর্তা। কবি বল্লভদাস তাঁকে 'বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য' উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর পদে রাধা চরিত্রের বিকাশ ও রসোত্তীর্ণ পরিণতি লক্ষণীয়।
মঙ্গলকাব্য: ধারা, শ্রেণিবিভাগ ও প্রধান কাব্যসমূহ
পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ (১৭৬০ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে ধর্ম ও সমাজাশ্রিত যে আখ্যানকাব্য ধারা বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, তাকে মঙ্গলকাব্য বলা হয়। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে প্রায় ৬২ জন কবি বিভিন্ন রচনা করেছেন।
মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা, নামকরণ ও সাধারণ লক্ষণ:
- সংজ্ঞা ও নামরহস্য: 'মঙ্গল' শব্দের অর্থ কল্যাণ। বিশ্বাস করা হতো এ কাব্য পাঠ বা শ্রবণে গৃহের মঙ্গল হয়; অথবা মঙ্গলবার শুরু হয়ে পরবর্তী মঙ্গলবার শেষ হতো বলে একে বলা হয়। কাব্যের মূল উপজীব্য হলো মর্ত্যে দেবদেবীর লীলামাহাত্ম্য প্রচার ও পূজা প্রতিষ্ঠা।
- সাধারণ লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- প্রায় সকল কবিই স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে কাব্য রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন।
- কাব্যের প্রারম্ভে সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ ও অন্যান্য দেবদেবীর বন্দনা।
- ের নায়ক-নায়িকারা মূলত শাপভ্রষ্ট দেবতা, মর্ত্যে পূজা প্রচার শেষে শাপমুক্ত হয়ে স্বর্গে ফিরে যান।
- দেবদেবীদের আচরণ মানবিক দোষ-গুণ, ক্রোধ ও ভালোবাসায় পূর্ণ।
- কাব্যে অন্ত্যজ ও সাধারণ বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
- একটি পূর্ণাঙ্গ মঙ্গলকাব্যের ৪টি অংশ:
- ক. বন্দনা
- খ. আত্মপরিচয় ও গ্রন্থোৎপত্তির কারণ
- গ. দেবখণ্ড
- ঘ. নরখণ্ড
বিশেষ পারিভাষিক রূপ:
- বারমাস্যা / বারোমাসী: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে নায়ক বা নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের ধারাবাহিক আখ্যানমূলক বর্ণনা (যেমন: চণ্ডীমঙ্গলের 'ফুল্লরার ')।
- চৌতিশা: বিপন্ন নায়ক-নায়িকা কর্তৃক ব্যঞ্জনবর্ণের ক থেকে হ পর্যন্ত ৩৪টি অক্ষর প্রতিটি পদের আদিতে প্রয়োগ করে ইষ্টদেবতার যে স্তব বা বন্দনা রচনা করা হয়, তাকে চৌতিশা বলে।
মঙ্গলকাব্যের শ্রেণিবিভাগ ও প্রধান শাখাসমূহ:
প্রধানত ২ প্রকার:
- পৌরাণিক শ্রেণি: গৌরীমঙ্গল, ভবানীমঙ্গল, দুর্গামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, কমলামঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, চণ্ডিকামঙ্গল।
- লৌকিক শ্রেণি: , চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, কালিকামঙ্গল (বিদ্যাসুন্দর), শিবমঙ্গল (শিবায়ন), শীতলামঙ্গল, রায়মঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, সারদামঙ্গল ইত্যাদি।
প্রধান ৪টি শাখা: , চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল এবং ধর্মমঙ্গল। এর মধ্যে মনসা ও চণ্ডী দেবীর প্রাধান্য ছিল সর্বাধিক।
প্রধান মঙ্গলকাব্য ধারার বিশদ পরিচয়:
১. মনসামঙ্গল (পদ্মপুরাণ):
- বিষয়বস্তু: সাপের অধিষ্ঠাত্রী লৌকিক দেবী মনসার (কেতকী/পদ্মাবতী) পূজা প্রতিষ্ঠা। নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের চরম বিদ্রোহ এ কাব্যের মূল সুর। এটি ৮ দিনে পরিবেশন করা হতো; শেষ দিনের অংশকে 'অষ্টামঙ্গল' বলা হয়।
- আদি কবি: কানাহরি দত্ত।
- শ্রেষ্ঠ কবি: বিজয়গুপ্ত (বরিশালের গৈলা-ফুল্লশ্রী গ্রামে জন্ম; সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে ১৪৯৪ সালে কাব্যাংশ 'পদ্মপুরাণ' রচনা করেন)।
- অন্যান্য কবি: নারায়ণ দেব (কিশোরগঞ্জের বোর গ্রাম), দ্বিজ বংশীদাস (কিশোরগঞ্জের পাতোয়ারী গ্রাম; প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর পিতা), কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ।
- 'বাইশা': ের জনপ্রিয়তার কারণে বিভিন্ন ২২ জন কবির কাব্যাংশ সংকলন করে তৈরি পদসংকলন 'বাইশ কবির ' বা বাইশা নামে পরিচিত।
- কাহিনি সংক্ষেপ: শিবভক্ত ধনকুবের চাঁদ সওদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকার করলে মনসা তাঁর ছয় পুত্রকে হত্যা ও সপ্তডিঙা মধুকর ডুবিয়ে সর্বস্বান্ত করে। স্বর্গের অভিশপ্ত অনিরুদ্ধ-উষা মর্ত্যে লখিন্দর ও বেহুলা রূপে জন্ম নেয়। লোহার বাসরঘরে কালনাগিনী লখিন্দরকে দংশন করলে সতী বেহুলা কলার ভেলায় স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে দেবালয়ে গিয়ে দেবতাদের তুষ্ট করে স্বামীবন্ধু ও ধনসম্পদ ফেরত আনে। অবশেষে বেহুলার অশ্রুবিজয়ে চাঁদ সওদাগর বাঁ হাতে মুখ ফিরিয়ে মনসাকে ফুল ছুড়ে পূজা দেন।
২. চণ্ডীমঙ্গল:
- বিষয়বস্তু ও খণ্ড: দেবী চণ্ডীর পূজা প্রচার। কাব্যটি দুই খণ্ডে বিভক্ত— ১. আখেটিক বা ব্যাধ কালকেতু-ফুল্লরার খণ্ড এবং ২. বণিক ধনপতি সওদাগর ও খুল্লনার খণ্ড।
- আদি কবি: মানিক দত্ত।
- শ্রেষ্ঠ কবি: মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। জমিদার রঘুনাথ রায় তাঁকে 'কবিকঙ্কন' উপাধি দেন। তাঁর বাস্তব চরিত্রচিত্রণের কারণে তাঁর কাব্যে আধুনিক উপন্যাসের লক্ষণ ও সমাজবাস্তবতা বিদ্যমান।
- স্বভাব কবি: চণ্ডীমঙ্গলের কবি দ্বিজ মাধব-কে 'স্বভাব কবি' বলা হয় (তাঁর রচিত কাব্য 'সারদামঙ্গল', ১৫৭৯)।
- কালকেতু উপাখ্যান: ইন্দ্রের পুত্র নীলাম্বর শাপভ্রষ্ট হয়ে মর্ত্যে ব্যাধ কালকেতু রূপে জন্মায় এবং ফুল্লরার সাথে সংসার পাতে। দেবী স্বর্ণগোধিকা রূপ ধরে ঘরে এলে ফুল্লরা বর্ণনা করে। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে ৭ ঘড়া ধন দান করেন। কালকেতু বন কেটে গুজরাট নগর পত্তন করে রাজা হয়। প্রতারক ভাঁড়ুদত্তের চক্রান্তে কলিঙ্গ রাজার হাতে বন্দি হলেও দেবীর কৃপায় মুক্তি পেয়ে স্বর্গে ফিরে যায়।
৩. অন্নদামঙ্গল:
- কবি: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২–১৭৬০)। তিনি হাওড়া-হুগলির ভূরসুট পরগনার পেঁড়ো (পাণ্ডুয়া) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাগরিক কবি এবং ের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ কবি। ১৭৬০ সালে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে।
- রচনাকাল ও খণ্ড: নবদ্বীপের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে ১৭৫২-৫৩ সালে ৩টি খণ্ডে রচিত:
- শিবনারায়ণ অন্নদামঙ্গল
- বিদ্যাসুন্দর কালিকামঙ্গল
- মানসিংহ-ভবানন্দ অন্নদামঙ্গল (সম্রাট জাহাঙ্গীর, মানসিংহ ও ভবানন্দ মজুমদারের ঐতিহাসিক সমাবেশ)।
- ঈশ্বরী পাটনী ও বিখ্যাত পঙ্ক্তি:
- খেয়াঘাটের মাঝি ঈশ্বরী পাটনীর অমর প্রার্থনা: "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।"
- "নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?"
- "মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।"
- "বড়র পিরীতি বালির বাঁধ! ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।"
৪. ধর্মমঙ্গল:
- বিষয়বস্তু: পুরুষ দেবতা ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচার। কাব্যটি দুটি পালায় বিভক্ত: ১. রাজা হরিশচন্দ্রের কাহিনি এবং ২. লাউসেনের কাহিনি।
- আদি কবি: ময়ূরভট্ট (কাব্য: 'হাকন্দপুরাণ')।
- শ্রেষ্ঠ কবি: ঘনরাম চক্রবর্তী (কাব্য: 'শ্রীধর্মমঙ্গল')। অন্যান্য কবি: রূপরাম চক্রবর্তী, শ্যাম পণ্ডিত।
৫. অন্যান্য অপ্রধান মঙ্গলকাব্য:
- কালিকামঙ্গল (বিদ্যাসুন্দর): আদি কবি কবি কঙ্ক। অন্যান্য কবি: সাবিরিদ খান ও রামপ্রসাদ সেন (উপাধি 'কবিরঞ্জন', শ্যামাসংগীতের রূপকার)। কাশ্মীরের কবি বিলহনের সংস্কৃত 'চৌরপঞ্চাশিকা' অবলম্বনে রচিত।
- শিবমঙ্গল (শিবায়ন): কৃষক শিবের সুখ-দুঃখের কাহিনি। প্রথম কবি রামকৃষ্ণ রায়, প্রথম কাব্য দ্বিজ রতিদেবের 'মৃগলুব্ধ' (১৬৭৪), শ্রেষ্ঠ কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য (কাব্য: 'শিবকীর্তন')।
প্রধান মঙ্গলকাব্য, রচয়িতা ও চরিত্রের তুলনামূলক ছক:
| মঙ্গলকাব্যের নাম | প্রধান রচয়িতাগণ | প্রধান চরিত্রসমূহ |
|---|---|---|
| মনসামঙ্গল | কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ | চাঁদ সওদাগর, বেহুলা, লখিন্দর, সনকা, নেতো ধোপানী, মনসা দেবী |
| চণ্ডীমঙ্গল | মানিক দত্ত, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, দ্বিজ মাধব, মুক্তারাম সেন | কালকেতু, ফুল্লরা, ধনপতি সওদাগর, খুল্লনা, ভাঁড়ুদত্ত, মুরারি শীল |
| অন্নদামঙ্গল | ঈশ্বরী পাটনী, ভবানন্দ মজুমদার, হীরামালিনী, মানসিংহ, জাহাঙ্গীর | |
| ধর্মমঙ্গল | ময়ূরভট্ট, রূপরাম চক্রবর্তী, ঘনরাম চক্রবর্তী, শ্যাম পণ্ডিত | হরিশচন্দ্র, লাউসেন, ধর্মঠাকুর |
জীবনী সাহিত্য ও নাথ সাহিত্য
মধ্যযুগে গতানুগতিক দেবদেবী নির্ভর সাহিত্যের বাইরে রক্তমাংসের মানুষের জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করে যে স্তুতিমূলক ও প্রামাণ্য ইতিহাসধর্মী কাব্যধারা গড়ে ওঠে, তাকে জীবনী সাহিত্য বলা হয়।
শ্রীচৈতন্যদেব ও জীবনী সাহিত্যের উন্মেষ:
- শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬–১৫৩৩): পিতৃপ্রদত্ত নাম বিশ্বম্ভর মিশ্র এবং ডাকনাম নিমাই। তিনি একটি পঙ্ক্তিও রচনা না করেও তাঁর প্রবর্তিত 'মানবপ্রেম ধর্ম' এবং বৈপ্লবিক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের দ্বারা গোটা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: "মুচি হয়ে শুচি হয় যদি কৃষ্ণ ভজে।"
- কড়চা: শ্রীচৈতন্যদেব ও তাঁর সমসাময়িক সাধকদের জীবনঘটনা নিয়ে ভক্তদের রচিত স্মৃতিকথামূলক দিনলিপি বা ডায়েরিকে 'কড়চা' বলা হয়।
প্রধান চৈতন্য জীবনীগ্রন্থসমূহ:
- মুরারি গুপ্তের কড়চা: সংস্কৃত ভাষায় রচিত শ্রীচৈতন্যদেবের সর্বপ্রথম জীবনীগ্রন্থ। এর প্রকৃত নাম 'শ্রী শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্যচরিতামৃত'।
- 'চৈতন্য-ভাগবত': কবি বৃন্দাবন দাস ১৫৪৮ সালে এটি রচনা করেন। এটি বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ।
- 'চৈতন্যচরিতামৃত' (১৬১৫ খ্রি.): কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় সর্বাপেক্ষা তথ্যবহুল, দার্শনিক ও শ্রেষ্ঠ চৈতন্য জীবনীকাব্য।
- 'চৈতন্যমঙ্গল': লোচন দাস এবং জয়ানন্দ পৃথকভাবে এ নামে চৈতন্য জীবনী রচনা করেন।
অন্যান্য জীবনী সাহিত্য:
- অদ্বৈত আচার্যের জীবনী: বৈষ্ণব ধর্মের প্রবীণ মহাপুরুষ অদ্বৈত আচার্যকে নিয়ে হরিকৃষ্ণ দাস সংস্কৃতে রচনা করেন 'বাল্যলীলাসূত্র' (১৪৮৭)। পরবর্তীতে বাংলায় প্রথম ঈশান নাগর রচনা করেন 'অদ্বৈতপ্রকাশ' এবং হরিচরণ দাস রচনা করেন 'অদ্বৈতমঙ্গল'।
- মুসলিম কবিদের জীবনীকাব্য: মধ্যযুগের প্রখ্যাত মুসলিম কবি সৈয়দ সুলতান রচনা করেন বিখ্যাত জীবনীকাব্যগ্রন্থ 'নবী বংশ', 'শব-ই-মিরাজ' এবং 'রসুল বিজয়'।
বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামী:
শ্রীচৈতন্যদেবের নির্দেশনায় বৃন্দাবনে অবস্থান করে বৈষ্ণব শাস্ত্র রচনা ও ধর্মীয় সমাজ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দানকারী ৬ জন প্রধান শিষ্যকে 'বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামী' বলা হয়:
- বৈষ্ণব শাস্ত্রকার: ১. সনাতন গোস্বামী, ২. জীব গোস্বামী, ৩. রূপ গোস্বামী।
- বৈষ্ণব সমাজ ও প্রচারক: ৪. রঘুনাথ ভট্ট, ৫. রঘুনাথ দাস, ৬. গোপাল ভট্ট।
নাথ সাহিত্য:
দশম ও একাদশ শতকে বৌদ্ধ সহজযান ও শৈবধর্মের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা 'নাথধর্ম'-এর সিদ্ধাচার্যদের মাহাত্ম্য নিয়ে যে আখ্যানকাব্য রচিত হয়, তাকে নাথ সাহিত্য বলে।
- প্রধান চার সিদ্ধাচার্য: আদিনাথ শিব, মীননাথ, হাড়িপা ও কানুপা।
- প্রধান দুই ধারা:
- মীননাথ ও তাঁর শিষ্য গোরক্ষনাথের উদ্ধারের কাহিনি।
- রানি ময়নামতী ও রাজা গোপীচন্দ্রের (গোবিন্দচন্দ্র) সন্ন্যাস কাহিনি।
- প্রধান কবি ও কাব্য:
- শেখ ফয়জুল্লাহ: ের প্রধান ও আদি কবি। তাঁর রচিত বিখ্যাত নাথ আখ্যানকাব্যের নাম 'গোরক্ষ বিজয়'। প্রখ্যাত পুঁথি গবেষক মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এ গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন।
- শুকুর মহম্মদ: নাথ কাব্য 'গোপীচাঁদের সন্ন্যাস' রচনা করেন।
- ভবানী দাস: রচনা করেন 'ময়নামতির গান'।
- অন্যান্য কবি: ভীমসেন রায়, শ্যামদাস সেন প্রমুখ।
মর্সিয়া সাহিত্য ও মধ্যযুগের যুদ্ধকাব্য
মুসলমান সংস্কৃতির নানা শোকাবহ ও বিষাদময় ঐতিহাসিক ঘটনা, বিশেষ করে হিজরি ৬১ সনে কারবালার মরুপ্রান্তরে মহানবীর (সা.) প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদাতকে উপজীব্য করে বাংলায় যে শোককাব্য ধারা গড়ে ওঠে, তাকে মর্সিয়া সাহিত্য বলা হয়।
মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি ও স্বরূপ:
- শব্দতত্ত্ব: 'মর্সিয়া' বা 'মসিঁয়া' শব্দটি আরবি 'রিসা' ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ শোক প্রকাশ করা বা বিলাপ করা।
- বিষয়বস্তু: কারবালার শোকাবহ যুদ্ধ-বিগ্রহ, ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ এবং আহলে বায়াতের সদস্যদের বন্দিদশা ও ট্র্যাজেডি।
- যুদ্ধকাব্য বা জঙ্গনামা: মহানবী (সা.) ও পরবর্তী বংশধরদের ইসলামের সত্য প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বীরত্বপূর্ণ লড়াই নিয়ে রচিত কাব্যকে যুদ্ধকাব্য বা জঙ্গনামা বলা হয় ('জঙ্গ' ফারসি শব্দ, অর্থ যুদ্ধ; 'নামা' অর্থ ইতিহাস বা বিবরণ)।
প্রধান মর্সিয়া ও যুদ্ধকাব্যের কবি ও কাব্যসমূহ:
- শেখ ফয়জুল্লাহ: বাংলা ভাষায় ের আদি বা প্রথম কবি। কারবালার বিষাদময় কাহিনির ওপর ভিত্তি করে ১৫৭০ সালে তিনি রচনা করেন 'জয়নবের চৌতিশা'।
- দৌলত উজির বাহরাম খান: কারবালার যুদ্ধকে উপজীব্য করে ১৭২৩ সালে রচনা করেন কালজয়ী যুদ্ধকাব্য 'জঙ্গনামা'।
- শাহ বারিদ খান: রচনা করেন বিখ্যাত 'রসুল বিজয়' এবং যুদ্ধকে পটভূমি করে রচিত রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান 'হানিফা-কয়রাপরী'।
- মুহম্মদ খান: সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত মর্সিয়া কাব্য 'মক্তুল হোসেন' রচনা করেন।
- ফকির গরীবুল্লাহ: রচনা করেন বিখ্যাত যুদ্ধকাব্য 'আমীর হামজা'।
- সৈয়দ সুলতান: রচনা করেন 'জয়কুম রাজার লড়াই'।
- শেরবাজ: রচনা করেন কারবালার সংঘাতভিত্তিক পুথিকাব্য 'কাশিমের লড়াই'।
- জাফর: রচনা করেন 'শহীদ-ই-কারবালা'।
- রাধারমণ গোপ (অমুসলিম/হিন্দু কবি): মর্সিয়া ধারায় হিন্দু কবি পরম ভক্তিতে রচনা করেন 'ইমামগণের কেচ্ছা' এবং 'আফৎনামা'।
প্রধান মধ্যযুগীয় যুদ্ধকাব্য ও রচয়িতাদের তালিকা ছক:
| কাব্যের নাম | রচয়িতার নাম | কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| জঙ্গনামা | দৌলত উজির বাহরাম খান | কারবালার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ইমাম হোসেনের শাহাদাত |
| জয়নবের চৌতিশা (১৫৭০) | শেখ ফয়জুল্লাহ | বাংলা সাহিত্যের প্রথম মর্সিয়া কাব্য (৩৪ অক্ষরে শোকগাথা) |
| রসুল বিজয় | শাহ বারিদ খান | মহানবী (সা.)-এর জীবনালেখ্য ও যুদ্ধজয় |
| হানিফা-কয়রাপরী | শাহ বারিদ খান | যুদ্ধ উপজীব্য রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান |
| মক্তুল হোসেন | মুহম্মদ খান | কারবালার শোকাবহ শাহাদাতনামা |
| আমীর হামজা | ফকির গরীবুল্লাহ | হযরত আমীর হামজার বীরত্ব ও যুদ্ধগাথা |
| জয়কুম রাজার লড়াই | সৈয়দ সুলতান | মুসলিম বীরদের সংঘাত ও লড়াইয়ের উপাখ্যান |
| কাশিমের লড়াই | শেরবাজ | কারবালায় কাসেমের যুদ্ধ ও শাহাদাত |
| শহীদ-ই-কারবালা | জাফর | কারবালার শহিদদের স্মৃতিচারণমূলক শোককাব্য |
| ইমামগণের কেচ্ছা | কারবালার ইতিহাস নিয়ে হিন্দু কবির রচিত কাব্য |
লোকসাহিত্য, গীতিকা ও অন্যান্য শাখা (ডাক-খনার বচন)
সংস্কৃতির যে সকল সাহিত্যগুণসম্পন্ন সৃষ্টি লেখনির মাধ্যমে নয়, বরং আবহমান কাল ধরে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে রচিত, গীত ও সংরক্ষিত হয়ে অগ্রসর হয়েছে, তাকে লোকসাহিত্য বলা হয়। কে বাংলা সাহিত্যের 'শিকড়সন্ধানী সাহিত্য' এবং 'জনগণের হৃদয়কলরব' বলা হয়।
লোকসাহিত্যের উপাদান ও সংগ্রাহকগণ:
- আদিরূপ ও উপাদান: ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, লোককথা, লোকগীতি, গীতিকা, লোকনাটক ইত্যাদি। এর মধ্যে ছড়া, প্রবাদ ও ধাঁধাকে ের আদিরূপ মনে করা হয়। গ্রামীণ লোককবিদের সাধারণত 'বয়াতি' বলা হয়।
- প্রধান সংগ্রাহক ও গবেষকগণ:
- ড. দীনেশচন্দ্র সেন: পল্লী অঞ্চল থেকে পুঁথি ও গান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থ 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' (১৮৯৬), 'মৈমনসিংহ গীতিকা' (১৯২৩) ও 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' (১৯২৬)।
- চন্দ্রকুমার দে: নেত্রকোনার আইথর গ্রামের অধিবাসী; তিনি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের উৎসাহে ভাটি অঞ্চল ঘুরে ঘুরে র অমূল্য পালাগানগুলো সংগ্রহ করেন।
- রেভারেন্ড লাল বিহারী দে: ১৮৮৩ সালে প্রকাশ করেন বিখ্যাত ইংরেজি সংকলন 'Folk Tales of Bengal'।
- মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন: ১৩টি খণ্ডে বিখ্যাত লোকসংগীত সংকলন 'হারামণি' সম্পাদনা করেন।
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার: রূপকথা ও লোককাহিনির অমর গ্রন্থ 'ঠাকুরমার ঝুলি' এবং 'ঠাকুরদাদার ঝুলি' সংকলন করেন।
- অন্যান্য গবেষক: ড. সুশীল কুমার দে ('প্রবাদ সংগ্রহ'), ড. মযহারুল ইসলাম ('কবি পাগলা কানাই'), ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবি জসীমউদ্দীন, ক্ষিতিমোহন সেন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
গীতিকা সাহিত্য (Ballads):
ইংরেজিতে একে Ballad বলা হয়। এগুলো মূলত দীর্ঘ আখ্যানমূলক লোকগীতি, যাতে কোনো প্রেমকাহিনি বা ট্র্যাজেডির মর্মস্পর্শী বর্ণনা থাকে। বাংলাদেশে তিন ধরনের গীতিকা প্রচলিত:
১. নাথ গীতিকা:
একটিমাত্র ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু— রাজা গোপীচাঁদ বা গোবিন্দচন্দ্রের সন্ন্যাস অবলম্বনকে কেন্দ্র করে রচিত।
- ১৮৭৮ সালে ভাষাবিজ্ঞানী স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন রংপুরের কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে 'মানিকচন্দ্র রাজার গান' প্রকাশ করেন (যা ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'গোপীচন্দ্রের গান' নামে প্রকাশিত হয়)।
- উল্লেখযোগ্য পালা: ভবানী দাসের 'ময়নামতির গান' এবং শুকুর মহম্মদের 'গোপীচাঁদের সন্ন্যাস'।
২. মৈমনসিংহ গীতিকা:
বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত ১০টি কালজয়ী পালার সংকলন। চন্দ্রকুমার দে সংগৃহীত এবং ড. দীনেশচন্দ্র সেনের একক সম্পাদনায় ১৯২৩ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয়। এটি বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
মৈমনসিংহ গীতিকার ১০টি পালার তালিকা:
| পালার নাম | রচয়িতার নাম | প্রধান চরিত্রসমূহ |
|---|---|---|
| ১. মহুয়া | দ্বিজ কানাই | নদের চাঁদ, মহুয়া, হুমরা বেদে |
| ২. মলুয়া | চন্দ্রাবতী | মলুয়া, চাঁদ বিনোদ, কাজী |
| ৩. কমলা | দ্বিজ ঈশান | কমলা, রাজকুমার মানিক |
| ৪. দস্যু কেনারামের পালা | চন্দ্রাবতী | দস্যু কেনারাম, দ্বিজ বংশীদাস |
| ৫. দেওয়ানা মদিনা | মনসুর বয়াতি | আলাল, দুলাল, মদিনা |
| ৬. দেওয়ান ভাবনা | চন্দ্রাবতী | দেওয়ান ভাবনা, সুনাই |
| ৭. কাজলরেখা | অজ্ঞাত | কাজলরেখা, সূচরাজা |
| ৮. চন্দ্রাবতী | নয়ানচাঁদ ঘোষ | জয়চন্দ্র, চন্দ্রাবতী |
| ৯. কঙ্ক ও লীলা | দামোদর, রঘুসুত, নয়ানচাঁদ ঘোষ | কঙ্ক, লীলা, গর্গ সর্বজ্ঞ |
| ১০. রূপবতী | অজ্ঞাত | রূপবতী, রামচন্দ্র |
- 'মহুয়া' পালার কাহিনি সংক্ষেপ: দ্বিজ কানাই রচিত 'মহুয়া' পালায় বেদেনী মহুয়া ও বামন জমিদারপুত্র নদের চাঁদের অদম্য মানবিক প্রেমের মর্মস্পর্শী ট্র্যাজেডি বর্ণিত হয়েছে। বেদে সর্দার হুমরার কঠোর বাধা ও সামাজিক ব্যবধান ডিঙিয়ে মিলনপ্রয়াসী এই দুই প্রেমিক হৃদয়ের অন্তিম পরিণতি ঘটে আত্মাহুতি ও আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে।
৩. পূর্ববঙ্গ গীতিকা:
চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল থেকে সংগৃহীত এবং ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ খণ্ডে প্রকাশিত। এতে ৫০টির অধিক পালা রয়েছে।
- উল্লেখযোগ্য পালাসমূহ: নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোরা, কমল সওদাগর, চৌধুরীর লড়াই, কাঞ্চন মালা, আয়না বিবি, ভেলুয়া, কমলা রাণীর গান ইত্যাদি।
ডাক ও খনার বচন:
প্রাচীন যুগের শেষভাগে উৎপত্তি হলেও মধ্যযুগের প্রারম্ভে এগুলো বাংলার লোকজীবনে গভীর ভিত্তি লাভ করে:
- ডাকের বচন: বৌদ্ধ সমাজের জ্ঞানপুরুষ 'ডাক'-এর নামানুসারে এর উৎপত্তি। কৃষিজীবী সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ নৈতিক ও ব্যবহারিক উপদেশবাণী এতে ছন্দাকারে বর্ণিত হয়েছে।
- খনার বচন: প্রাচীন ভারতীয় বিদুষী জ্যোতির্বিদ খনার রচিত কৃষিতত্ত্ব, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ছন্দোবদ্ধ অমর প্রবাদ ও বচন।
অধ্যায়টি পড়া সম্পন্ন হয়েছে?
কুইজ প্রশ্নের মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করুন অথবা ফ্ল্যাশকার্ড দিয়ে দ্রুত রিভিশন দিন।